ক্রাইস্টচার্চে যা ঘটলো

ক্রাইস্টচার্চে যা ঘটলো

0

ফজলুল বারী:ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে শুক্রবারের নামাজে অভাবনীয় হামলা-হত্যাকান্ডের পর বাংলাদেশের নানা মিডিয়ার রিপোর্ট পড়ে টিভির টকশোর আলোচনা দেখে শুনে অসহায় লাগছিল। কারন নিউজিল্যান্ড দেশটি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের তথ্য ঘাটতি অথবা ধারনার অভাব। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কেনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়নি, পুলিশ কেনো দেরিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছলো, কেনো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে জঙ্গী বলা হলোনা, কেনো নিউজিল্যান্ডের এতো মানুষের হাতে অস্ত্র, এমন নানা প্রশ্ন। হত্যাকান্ড পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের ভূমিকায় অবশ্য পরে এসব প্রশ্ন মিইয়ে আসে। সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখেন জেসিন্ডা কী করে শোককে শক্তিতে পরিনত করে ঐক্যবদ্ধ করলেন পুরো নিউজিল্যান্ডকে। মুসলিম নারীর মতো মাথায় ওড়না দেয়া জেসিন্ডাকে মনে হচ্ছিল একান্ত আপন পাশের বাড়ির আপা অথবা ভাবীর মতো একজন। প্রধানমন্ত্রী হবার পর মা হন জেসিন্ডা। বেনজির ভূট্টোর পর তিনিই বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি ক্ষমতায় গিয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি আগেই বিশ্ব মিডিয়ার নজরে ছিলেন। ক্রাইস্টচার্চ ট্র্যাজেডির পর তিনি হয়ে গেলেন পুরো দেশটির ঐক্যের প্রতীক। অভাবনীয় ঘটনায় দেশটির ভীতসন্ত্রস্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মা। শোক সেখানে এক অবিস্মরনীয় ঐক্য আর ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

ক্রাইস্টচার্চ শহরটি নিয়ে একটু আলাপ করি। নিউজিল্যান্ড একটি ভূমিকম্প প্রবন দেশ। এ দেশটিতে সুপ্ত-পরিত্যক্ত আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব আছে। অনেক এলাকার পুকুরে-লেকের ধুমায়মান পানিতে এখনো বুদবুদ ওঠে। স্পর্শ করলে পানিতে গরম অনুভব হয়। হট ওয়াটার বীচ নামের একটি সৈকতও আছে নিউজিল্যান্ডে। যেখানে পর্যটকরা সমুদ্র সৈকতের পানি-বালিতে পা ফুঁড়ে নীচের গরম তাপের আঁচ নেন। অনেক এলাকার পাহাড়-জঙ্গলের গা ঘেঁষে বেরোয় ধোয়ার কুন্ডলি। মনে করিয়ে দেয় এখানে আগ্নেয়গিরি আছে অথবা ছিলো। ভূমিকম্প প্রবন পরিস্থিতির কারনে নিউজিল্যান্ডে পাতাল রেল নেই।

কয়েক বছর আগের এক ভূমিকম্পে ক্রাইস্টচার্চের বড় অংশ বিধবস্ত হয়। শহরের অনেক বাসিন্দা ক্রাইস্টচার্চ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। বাংলাদেশিদের যারা এখন ক্রাইস্টচার্চে আছেন তারা কিন্তু সেই ভূমিকম্পের পর সেখানে গেছেন। ভূমিকম্পে বিধবস্ত শহরটির পুনঃনির্মানের কাজ পায় সিঙ্গাপুর ভিত্তিক একাধিক কোম্পানি। তারা তাদের পুরনো বেশকিছু স্টাফ-কর্মীকে ক্রাইস্টচার্চ নিয়ে যায়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সিংহভাগ এভাবে এদের সঙ্গে সিঙ্গাপুর থেকে শহরটায় গেছেন। এদের সংখ্যা এক-দেড়শ’র বেশি হবেনা। বাংলাদেশ দলের খেলা দেখতেও আশেপাশের বিভিন্ন শহরের অনেক বাংলাদেশি ওই সময়ে ক্রাইস্টচার্চ আসেন। বাংলাদেশি যারা অভিবাসন নিয়ে নিউজিল্যান্ডে গেছেন তাদের সিংহভাগ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক এবং প্রকৌশলী। কাজের সুযোগ কম থাকায় পড়াশুনা করতে খুব কমসংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিউজিল্যান্ড যান। বিদেশে যারা অভিবাসন নিয়ে যেতে চান তারা সংশ্লিষ্ট দেশের পয়েন্ট পদ্ধতির গুরুত্ব বোঝেন। ক্রাইস্টচার্চের পুনঃনির্মানে নিউজিল্যান্ড সরকারও অভিবাসন ইচ্ছুকদের সেখানে যেতে আগ্রহী করতে পয়েন্ট অফার করে। ক্রাইস্টচার্চ গেলে অত বোনাস পয়েন্ট। এরজন্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিউজিল্যান্ডের অন্য শহরগুলোর চাইতে ক্রাইস্টচার্চে অভিবাসন বেশি হয়েছে অথবা হচ্ছে।

এখন ক্রাইস্টচার্চে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গে আসি। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনেক বছর ধরে ঘোরাঘুরিতে একটা বিষয় বরাবর মনে হয়, তাহলো এরা বিশেষ কোন এলাকা বা প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো দেশটাকে নিরাপদ রাখতে চায়। গত বিশ্বকাপ ক্রিকেট কভার করতে বাংলাদেশি একজন টিভি সাংবাদিক সিডনি পৌঁছে অবাক বিস্ময়ে জানতে চান এখানে বিশ্বকাপ প্রস্তুতির সাজসজ্জা কোথায়। অথচ এমন কিছুতে বাংলাদেশে পুরো ঢাকা শহরকে মায়াবী সাজানো হয়। তাকে বলা হয় এরা এদের দেশকে সারাক্ষন ঝকঝকে সাজিয়ে রাখে। বিশ্বকাপ বা অন্যকিছুর জন্যে আলাদা করে সাজায়না। অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা আড়াই কোটি, নিউজিল্যান্ডে পয়তাল্লিশ লাখ। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের সম্পর্ক আবার ভাইবোনের মতো। নিউজিল্যান্ডের নাগরিক মাত্রই অটোমেটিক অস্ট্রেলিয়ার পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট। দেশ দুটিতে যাতায়াতে নাগরিক অথবা পারমানেন্ট রেসিডেন্টদের ভিসাও লাগেনা। সে জন্যে অস্ট্রেলিয়ান যে খুনি ক্রাইস্টচার্চে গিয়ে খুন করেছে তার সেখানে যেতে ভিসা লাগেনি। সেখানে বসে সে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে অস্ত্রও কিনতে পেরেছে।

এমনিতে নিউজিল্যান্ডে যেহেতু কাজ কম তাই অভিবাসীদের বেশিরভাগ দেশটির নাগরিকত্ব পাবার পর কাজের আশায় অস্ট্রেলিয়া চলে আসেন। বিশ্বের অন্যতম শান্তির দেশ বলা হয় নিউজিল্যান্ডকে। দুর্নীতি যেহেতু নেই সে কারনে বলা হয় এখানে এক বালতি পানিতে এক মগ পানি বেশি ঢেলে দিলে তাতে তা উপচে পড়ে বা এক মগ পানি সরিয়ে নিলে বালতির তলানি দেখা যায়। দেশটিতে হানাহানি বা নিকট সন্ত্রাসেরও কোন রেকর্ড নেই। যেহেতু ঘটনা কম সে কারনে নিউজিল্যান্ড গেলে সেদেশের পুলিশকে অতোটা একটিভ বা স্মার্টও মনে হয়না। হানাহানি না থাকায় দেশটার মন্ত্রীদের সঙ্গে কোন পুলিশ থাকেনা। ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার আগে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশ থাকতো মাত্র দু’জন।

বাংলাদেশ বা কোন দেশের ক্রিকেটারদেরই অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে কখনো নিরাপত্তা দেয়া হয়না। নিরাপত্তা কেউ চায়ও না। খেলার দিন পুলিশ মাঝেমাঝে মাঠে-গ্যালারিতে টহলে আসে। ক্রাইস্টচার্চের হত্যাকারী ক্রিমিনালকে আমার মুসলিম বিদ্বেষী, বর্নবাদী এবং অভিবাসন বিরোধী মনে হয়েছে। ইউরোপের কিছু জঙ্গী হামলা তার মাঝে মুসলিম বিদ্বেষের সূচনা যে করেছে সে তা তার ম্যানিফেস্টোতে লিখেছে। কিন্তু সে কোন ধার্মিক লোক না। কোন জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত মনে হয়নি। মুসলিম বিদ্বেষ তার মাঝে আরেক কারনে সৃষ্টি হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের খ্রিস্টানদের সিংহভাগ এখন হয় নাস্তিক অথবা ধর্মকর্ম করেনা। অথবা এর সময়ও তাদের নেই। অব্যবহৃত থাকতে থাকতে অনেক এলাকার চার্চ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এসব চার্চ কিনে মসজিদ বানাচ্ছে অভিবাসী মুসলমানরা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, শুক্রবারের জুম্মার নামাজ, ঈদের নামাজ এসবকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের ধর্মীয় তৎপরতা আবার অন্য যে কোন ধর্মাবলম্বী দৃশ্যমান হয় বেশি। এরজন্যে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা এই বর্নবাদী সন্ত্রাসী হয়তো মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি দেখে ঘৃনার পাশাপাশি ভীতসন্ত্রস্তও হতে পারে। কারন গত ৩০-৪০ বছরে লেবানন-সিওরোলিয়ন-আফগানিস্তান-ইরাক-সিরিয়া সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, এমনকি রোহিঙ্গা সহ যত মানুষ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছে এদের সিংভাগ মুসলিম। এই সন্ত্রাসীর অস্ত্রে বর্নবাদ এবং মুসলিম বিদ্বেষ দুটির টার্গেট করা হয়েছে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা তার টার্গেট ছিল এমন আমার মনে হয়নি। ক্রিকেটাররা টার্গেট হলে বা তারা আগেভাগে মসজিদে পৌঁছে গেলে বাংলাদেশের জন্যে খুব বিপদ হতো। যে কান্নার শেষ হতোনা কোন দিন।

এখন অস্ত্রের বিষয়ে আসি। পরিবেশবাদীদের আন্দোলনে নিউজিল্যান্ডের বেশিরভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এটি সবুজ কৃষি প্রধান পাহাড়-সমুদ্রের দেশ হলেও এ দেশটায় কোন সাপ নেই। বিষাক্ত পোকামাকড় নেই। শিল্প বলতে এখন মূলত কৃষি ভিত্তিক। গরু-ছাগল-ভেড়া-দুম্বা-ঘোড়ার খামার। পোলট্রিতো আছেই। নিউজিল্যান্ডের গুড়ো দুধ দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলোতে বিখ্যাত। হালাল মাংস বিখ্যাত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। যে দেশে মানুষ কম, মুসলমান কম, হালাল মাংস সে দেশ প্রক্রিয়াজাতকরন করে কী করে। ইসলাম ধর্মীয় কায়দায় এতো পশু-পাখি জবাই করার মৌলভী কোথায়। আসলে নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে এ কাজটি করে যন্ত্র। খামারে যেখানে যন্ত্রে গরু-ভেড়া বা মুরগি জবাই হয় সেখানে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং’এ অবিরাম বাজে মুসলমানদের পশু-পাখি জবাইর দোয়া অথবা মন্ত্র, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম, আল্লাহু আকবর’। মুসলিম পদ্ধতিতে মুরগি জবাইর সময় খেয়াল রাকা হয় গলা যাতে দ্বিখন্ডিত হয়ে না যায়। মেশিনতো এসব বোঝেনা। গলা দ্বিখন্ডিতই হয়। জবাইর পর মাংস পরিষ্কার করা, ধোয়া-প্যাকেট সবকিছুই করে যন্ত্র। এভাবেই নিউজিল্যান্ডের হালাল মাংস যায় সারা বিশ্বের মুসলিম মার্কেটে। হালাল আসলে একটি বিশ্বাস।

অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মতো উন্নত বিশ্বের কৃষকরা ধনাঢ্য ব্যক্তি। জিমি কার্টার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবার পর বাংলাদেশি মিডিয়া চিরায়ত বর্নবাদী চিন্তায় রিপোর্টে লিখলো, তিনি একজন বাদাম চাষী। আমেরিকার চাষী তথা খামারের মালিক কতোবড় ধনাঢ্য ব্যক্তি তা আমাদের অঞ্চলের লোকজনের ধারনায় আসে কম। নিউজিল্যান্ডের কৃষক খামার মালিকদের একেকজনও শতশত একরের জমি সহ নানান সম্পদের মালিক। তাদের বাড়িঘর-গাড়ি সবচেয়ে সুন্দর এবং বিলাসবহুল। অনেকের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার-স্পিডবোটও আছে। ধনীদের নানাখাতে অস্ত্র লাগে। টুরিস্ট গাইডরা যখন টুরিস্টদের আপেল বা কোন ফলের বাগান দেখাতে নিয়ে যান তখনও বাগানের বেড়া থেকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়াতে বলেন। নতুবা অবাঞ্চিত ব্যক্তি মনে করে খামার মালিক ফাঁকা গুলি করতে পারে। খামারে কুরবানির গরু জবাই করতেও অস্ত্র লাগে। বিশাল সব সাইজের গরু জবাইর জন্যে মাটিতে শোয়াবার মতো অত লোকজন এখানে নেই। সে কারনে টার্গেট গরুর মাথায় আগে একজন গুলি করে। গরু মাটিতে পড়ে গেলে তখন তার গলায় ছুরি চালানো হয়। নিউজিল্যান্ডের খামারে আমি এমন করে কুরবানির গরু জবাই করতে দেখেছি। যেহেতু অস্ত্র নিয়ে অপব্যবহারের রেকর্ড নেই সে কারনে সহজে অস্ত্র কেনার বিষয়টি নিয়ে আগে এভাবে ভাবা হয়নি। এখন ভাবা হবে।

বিদেশি ক্রিকেটারদের বাংলাদেশে নিরাপত্তার প্রশ্নটি এসেছে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে। শ্রীলংকা দলের ওপর যারা হামলা চালিয়েছে তারা ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী। এমন হামলার মাধ্যমে তারা বেহেস্তে যাবার স্বপ্নদেখে। এমন জঙ্গি গোষ্ঠী অথবা এর উপাদান বাংলাদেশে আছে। আরব আমিরাতের মতো মুসলিম দেশেও সে সুযোগ নেই। সে কারনে বিভিন্ন দল আরব আমিরাতে পাকিস্তানের সঙ্গে খেলতে যায়। কিন্তু পাকিস্তানে যেতে চায় না। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলাকারী স্বর্গে যেতে চায়নি। ইউরোপে মুসলিম জঙ্গিদের প্রতিশোধ অথবা অভিবাসীদের ভয় দেখাতে চেয়েছে। অথবা মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে সে ভয় পেয়েছে। ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পর বিদেশে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। বলা হয়েছে বিদেশে দল পাঠানোর আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেয়া হবে। আবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কিন্তু প্রায় পাকিস্তানে দল পাঠাতে চায়! পরীক্ষামূলক তারা সেখানে খেলোয়াড় পাঠায়ও।

এর আগে গত বিশ্বকাপের সময় এবং ২০১৭ তে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নিউজিল্যান্ড সফরের সময় আমি দলের সদস্যদের খুব কাছে যেতে দেখেছি। আমারতো মনে হয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথম দরকার হোটেলের মধ্যে খেলোয়াড়দের ভাত খাবার ব্যবস্থা করা। বিদেশে দল যখন যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সদস্যরা হোটেলে ব্যাগ রেখে ভাত খাবার হোটেলের সন্ধানে বের হন। আশেপাশের কোথায় ভারতীয় বা বাংলাদেশি রেষ্টুরেন্ট আছে তা খোঁজেন সবার আগে। বাঙালির ছেলেপুলে। বিদেশ বিভূঁইয়ে গেলেও হাতে মাখিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করবেই। দেশের দলের খেলোয়াড়দের দেখতে তাদের সঙ্গে ছবি তুলতে প্রবাসীদের অনেকে ভিড় করেন হোটেলে। খেলোয়াড়রা অনেক সময় প্রবাসীদের বাসা-বাড়িতেও খেতে যান। এসব কতোটা নিরাপদ তা ভেবে দেখার আছে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিদেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালানো যায়। ছাত্রদের সিংহভাগের হাতে হাতে বাংলাদেশের জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স। কাজেই খেলোয়াড়রা কোথায় কার গাড়িতে চলে যাচ্ছেন এসব দেখে ভয় করে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যদি দলের সঙ্গে একজন বাবুর্চি নেয় অথবা স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা করে তা দলের সদস্যদের এসব ঝুঁকি এড়াতে সাহায্য করবে।

ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পর মানুষ যেভাবে মুসলমানদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন এটাই এসব দেশের সৌন্দর্য। বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় শ্লোগান আছে ‘যার ধর্ম তার কাছে রাষ্ট্রের কী বলার আছে’। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড তেমন দেশ। এসব দেশের সরকার নাগরিকদের ধর্মের ওপর খবরদারি করেনা। রাষ্ট্র মনে করে এটি নাগরিকদের যারযার পছন্দের বিষয়। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের নীতি হলো, ধর্মকর্ম যার যার বাড়িতে অথবা ঘরের মধ্যে করো, কর্মস্থলে নয়। জনগনের বেশিরভাগ হয় নাস্তিক নয়তো ধর্মকর্ম না করলে অন্যের ধর্মপালনকে সম্মানের চোখে দেখে। বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু ছাত্রদের আমি মাঝে মাঝে একান্তে বলি, দেশে থাকতে চারপাশের নানাকিছুর কারনে সারাক্ষন ভাবতে আমি হিন্দু-সংখ্যালঘু, এখানে সে পরিস্থিতি নেই। কেউ এখানে নিজেদের সংখ্যালঘু ভাবেনা। এই বোধগুলোও সংঘবদ্ধভাবে ফুটে উঠেছে ক্রাইস্টচার্চে। মুসলমানদের মসজিদে হামলা-হত্যাকান্ডের ঘটনায় হতভম্ভ-লজ্জিত-শোকার্ত হয়েছে এই দেশ এই রাষ্ট্র এই সমাজ।

ভীতসন্ত্রস্ত মুসলমানদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে বারবার মুসলিমদের মাঝে চলে গেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। মাথায় তার ওড়না, চোখে অশ্রু, মুখে আস্থা ফেরানোর আশ্বাস। নিউজিল্যান্ডের সংসদে মুসলমানের আজান-দোয়া হয়েছে। হত্যাকান্ড পরবর্তী শুক্রবার জুম্মার নামাজ উপলক্ষে হাজার হাজার নিউজিল্যান্ডান মুসলমানদের মসজিদে এসেছেন। মেয়েরা মাথায় স্কার্ফ বেঁধে, সবাই মিলে ২ মিনিট নীরবতা পালন করে জানিয়েছেন তাদের সহানুভূতি সমর্থন। দেশটির পক্ষে এসবের নেতৃত্ব দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা। এক বর্নবাদী সন্ত্রাসী মসজিদে হামলা করে যে সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে তা ব্যর্থ হয়েছে। নিউজিল্যান্ড উল্টো সৃষ্টি করেছে ভালোবাসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নতুন দৃষ্টান্ত। ক্রাইস্টচার্চের ভালোবাসার কথা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ মন রাখবে বহুদিন।

Facebook Comments

You may also like

গুলতেকিন ভালো থাকলে ওপারে হুমায়ুন আহমেদও ভালো থাকবেন

ফজলুল বারী:গুলতেকিনের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে নেটিজানরা এখন বিশেষ