এবার আগুনের কাছে জিম্মি জীবন

এবার আগুনের কাছে জিম্মি জীবন

0
গত ২৮ মার্চ ,বৃহস্পতিবার বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুনের সময় এই বালকটি ফাটা পাইপের্ ফুটো বন্ধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে (ছবি :সংগৃহিত )

বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগে। ২৩ তলা ভবনটির ৯ তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে থাকে। প্রমাণিত হলো, নতুন পুরাতন বলে কিছু নেই এই শহরে। দক্ষিণ ঢাকা তথা পুরান ঢাকার মতোই সরু গলি আছে উত্তরে। ওয়াসা কৃপণ নন নগরের এই তল্লাটে। জলপানি দিলে ২৪ ঘণ্টা পানির কোনো অভাব নেই এসব ইমারতে। প্রায় সব ভবনের ‘প্রকাশ্য গোপন’ (ওপেন সিক্রেটের আর কী বাংলা হতে পারে?) নিজ নিজ গভীর নলকূপ আছে। রাসায়নিক দ্রব্যের তলপেট ফাটা মজুত নেই এখানে। তারপরেও আগুনকে আয়ত্তে আনতে খাবি খেতে হয় দমকলের লোকজনকে। ভিড় সামলানো আগুন সামলানোর চেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। ‘মজা’ দেখতে আসা মানুষের চাপে আগুন নেভানোর কাজ জটিল হয়ে পড়ে উত্তরেও। দিন গড়ায় আর মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

মানুষ কি কেবলই মজা দেখতে আসে?
কত মানুষ একসময়ের এই আবাসিক এলাকা এখনকার বাণিজ্যিক বনানীতে কাজ করতে আসেন, তার হিসাব আমাদের কাছে নেই। এ সংখ্যা হাজারে হাজার। অনেকেই অফিসে এসে মোবাইলটা চার্জে দিয়ে দেন, আগুনের হুল্লোড়ে জান বাঁচাতে ছুটে গিয়েছেন অনেকে। যখন মোবাইলের কথা মনে হয়েছে, তখন আর অফিসে ফিরে গিয়ে সেটা সংগ্রহের চেষ্টা বুদ্ধিমানের কাজ হতো না। বাড়ির লোকজন বন্ধুবান্ধব ততক্ষণে জেনে গেছে আগুনের খবর। বনানীতে অফিসে আসা মেয়েটা, লোকটা, বউটা, বেটিটা, স্বামীটা, ছেলেটা, বন্ধুটা, প্রেমিকটা ফোন ধরছে না কিংবা ফোনটা ডেড। এ রকম পরিস্থিতিতে খোঁজখবর নিতে আসা আত্মীয়স্বজনের ছুটে আসাটাই স্বাভাবিক। মজা দেখা পাবলিক বলে তাঁদের ঢালাওভাবে বলা কি ঠিক? একজন উদ্বিগ্ন বাবা লিখেছেন, বনানীতে অগ্নিকাণ্ডের খবরে উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম। কারণ, আমার ছেলের অফিস সেখানে। যদিও সে অক্ষত আছে। তবে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বহু মানুষ। এই উদ্বিগ্নতা থেকেই অনেকের ছুটে যাওয়া। উদ্বিগ্নতার পারদ তর তর করে উপরে ওঠে যখন এসএমএস আসে, ‘আমাদের বাড়িটার কাছেই এই মাত্র আমার ভাই ছুটে এসে জানাল, ১৫/১৬ জনকে সে ওপর থেকে লাফ দিতে দেখেছে তাদের ৭/৮ জন মারা গেছে।’ এ রকম দুর্ঘটনায় মানুষকে পরিষ্কার তথ্য হালনাগাদের ব্যবস্থা রাখতে হয়। কাকে কোন হাসপাতালে কখন পাঠানো হয়েছে, এটা অপেক্ষায় থাকা মানুষদের অনেক সাহায্য করে। ভিড় তাহলে আর বাড়ে না।
উৎসুক পাবলিক বা ছুটে আসা প্রিয়জনদের কাজে লাগানো সম্ভব
আগুনের পাঁচ ঘণ্টা পর সংবাদকর্মী নাহারের কাছ থেকে খবর আসে। নেভানোর সব রকম চেষ্টার পাঁচ ঘণ্টা পরেও আগুন নেভেনি কিন্তু উৎসুক পাবলিকের স্বেচ্ছা উদ্ধার তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। অনেকে ঝুঁকি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে নিজেরাও নেমেছেন। আমরা স্বীকার করি বা না করি, সাভারে উদ্ধারের সবচেয়ে কঠিন কাজটা উৎসুক পাবলিক শুরু করেছিল। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণ না পাওয়া সাধারণ মানুষ, রোগীর সাথি আর ছাত্রদের অমানুষিক পরিশ্রম আমরা সেদিনও প্রত্যক্ষ করলাম। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা হতবাক মানুষকে শক্তিতে পরিণত করা অসম্ভব নয়। জানা দরকার কৌশলটা।

এবার কয়টা তদন্ত কমিটি হবে, তারা কী তদন্ত করবে?
গোটা তিনেক কমিটি তো হবেই । ডাকসুর একটা কমিটির কথা নিতান্তই গুজব বলে মনে হয়। তবে রং ছাড়া অবসরদের নিয়ে একটা সিরিয়াস সিভিল সোসাইটি তদন্ত কমিটি হওয়া উচিত।

যেখানে মানুষ জানতে চাইবে, এক ঘণ্টার বেশি সময় কেন নিল দমকল? ঢাকায় কি দমকলের নতুন বিন্যাস দরকার? কথিত ইমারতটি কি আগের কোনো ঢাকাইয়া ভূমিকম্পে একটু কাত হয়ে গিয়েছিল? তারপর কী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল? আগুন নেভানোর কী ব্যবস্থা ছিল তাদের? পানির উৎস হাইড্রেন্টের হাল অবস্থা কী? এক কাতারে ২০/৩০টা ২০/২৫ তলার বিল্ডিং কীভাবে হলো। একটা ২০/২৫ তলা বিল্ডিংয়ের নিচতলায়, দোতলায় কিংবা বিভিন্ন তলায় রেস্টুরেন্ট বসল কীভাবে? সেই রেস্টুরেন্টে আগুন জ্বলে সারা দিন। সেই আগুনের ওপর বসে মুখ বুজে কেন কাজ করে হাজার হাজার মানুষ। কীভাবে আমরা বেঁচে আছি? রহস্যটা কী? দক্ষিণ ঢাকার সঙ্গে উত্তর ঢাকার তফাতটা কোথায় যেখানে ২০/২৫টা বিল্ডিং এক কাতারে গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে বানানো হয় রাজউকের নকশায় অনুমতিতে। দুটা বিল্ডিংয়ের মাঝখানে একটু পানের পিক ফেলার মতো জায়গাও রাখতে বলেনি রাজউক। কেন রাজউক এত কৃপণ এখানে? একটায় কোনো ঝামেলা হলে, বাকি সব কটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে চোখের নিমেষে। একটা কাত হলে, পড়বে বাকিগুলোর ওপর, সেটা রাজউক কেন বোঝে না? কেন চৌকিদার চোর হয়? বাংলাদেশে কি একজনও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, ভিসি, সচিব কি জেনারেল অবশিষ্ট নেই, যিনি দেশের জন্য এই শেষ কাজটি করার উদ্যোগ নেবেন স্রেফ দেশকে ভালোবেসে।

কতজন নিহত হলেন
সব দুর্যোগেই আমরা কেবল প্রাপ্ত লাশের হিসাব পাই, যাদের মৃতদেহ পাওয়া যায় না বা চেনা যায় না, তাদের হিসাব কে রাখবে। সাভারের সঠিক হিসাব আমরা জানি না। জানি না চুড়িহাট্টায় কতজন পুড়ে ছাই হয়েছে। বনানীতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির সংখ্যা ২৫ হয়ে গেছে। এই সংখ্যা যেন আর না বাড়ে। কিন্তু সব মানুষের হিসাব চাই।

(সূত্রঃ গওহার নঈম ওয়ারা, প্রথম আলো)

Facebook Comments

You may also like

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কের গতিশীলতায় আশাবাদ অস্ট্রেলীয় বিশ্লেষকদের

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার