অপরাহ্নের ভালবাসা  

অপরাহ্নের ভালবাসা  

0

বছর কয়েক আগে আমি সমুদ্র ভ্রমনে গিয়েছিলাম, সমুদ্র আমার ভেতরের ভাললাগার জমিনের বড় একটা অংশে দারুন আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে। আর অমন সুন্দরের ঠিকানায় যাবার পথটাতে মোটর যান চালাবার স্নায়ুচাপ নিতে চাইনি সেবার। তাই ট্রেনে চেপে বসেছিলাম ভাবনাহীন এক ভ্রমণের উদ্দ্যেশ্য।

এদেশে  দুরপাল্লার ট্রেন খুব ধিরে না গেলেও গতিময়তায় কিছুটা ধির লয় লক্ষ্য করা যায় । তাছাড়া দক্ষিন আটলান্টিকের পাড় ঘেঁষে জাওয়া রেলগাড়িতে যাত্রীর সংখ্যাও একটু কম চোখে পড়লো। ছোট ছোট শহর গুলোর মধ্যে দিয়ে ছুটে চলছিলো রেলগাড়িটি, ছিল না ছন্দপতনের  ছাপ।

ফিরবার পথে আমার সহযাত্রীর কাছ থেকে শোনা তার ভালবাসার মিষ্টি গল্পটা লিখে ফেলবো বলে আজ কলম তুলে নিলাম।

সহযাত্রীটি  ছিলেন এক শ্বেতাঙ্গ ভদ্রমহিলা।ওনার বয়স  ৬০ এর কাছাকাছি হবে,  ভীষণ প্রাঞ্ঝল মনে হচ্ছিল ভদ্রমহিলাকে। টেলিফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন আর মিষ্টি হাসির দোলায় দুলে উঠছিলো ওনার শরীর। ফরাসী ভাষায় কথা বলছিলেন, আমার অত্যন্ত সীমিত জ্ঞানের ফরাসী থেকে যেটুকু বুঝলাম উনি ফোনার ওপর পাশের মানুষটির কাছে কোন এক সুন্দর বার্তা পৌছে দিচ্ছেন। ফোনের আলাপ শেষ হলে উনি আমার দিকে ঘুরে তাকালেন, চোখে মুখে এক চাপা আনন্দের আভা ঠিকরে পড়ছিলো তখনো।  আমাদের আলাপ জমলো খুব । জমতেই হবে, উনি দারুন সুন্দর করে কথা বলেন আর আমি ও বলতে বা শুনতে ভালবাসি।

আলাপে জানতে পারলাম উনি ফিরছিলেন এক নিবিড় সুখ স্মৃতি নিয়ে, বয়ফ্রেন্ড ওনাকে আংটি পরিয়েছেন এবার। ওনার চোখ মুখে খেলে যাচ্ছিল এক নৈসর্গিক সুখের মেঘ রোদ্দুরের খেলা। বয়স যে শুধুমাত্র একটি সংখ্যা তা কিছু কিছু মানুষ না দেখলে অনুমান করা ভার।

উনি বলেই চললেন যে কিভাবে তাদের পরিচয়, কিভাবে একে অপরকে শ্রদ্ধা আর ভালবাসা দিয়ে বাঁধলেন । এত কাছাকাছি আসতে তেমন একটা সময় ওনারা নেননি,

— ভাবছো বুঝি মাত্র এ কয়মাসে আংটি পরে নিলাম কি করে ?

আমি মিষ্টি হেসে বললাম, না না, আমি ঠিক তেমনটি কিছু ভাবছি না, আমি শুধু দেখছি একজন সুখী মানুষের হাসি আপনার চোখে আর গোটা মুখায়বে।

উনি কি মনে করলেন জানিনা, বলেই চললেন,

— আসলে কি জানো তো! জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছি আমরা, সন্তানদের প্রতি দায় দায়িত্ব পালন শেষ। এখন শুধু দুজন মানুষ একে অপরের সঙ্গী হয়ে থাকা, ভাল আর মন্দ দুই ই মিলিয়ে একে অপরকে সঙ্গ দেওয়া।

আমিও সম্মতিসূচক মাথা নাড়লাম।

ঘরের আসবাব পত্রে আসবে কিছুটা পরিবর্তন , কিছু সমঝোতা কিছু ত্যাগও রইবে সেই নতুন আয়োজনে। ওনার পছন্দ আধুনিক আসবাব আর ভদ্রলোকের পছন্দ পুরোনো আদলের কাঠের আসবাব পত্র ।

— আমরা এবার অনেক পরিকল্পনা করলাম কিভাবে দুজনের পছন্দের ফার্নিচারের এক সুস্থ যোগ সংযোগ ঘটাবো।

উনি সে সবের খানিক বর্ণনাও দিয়ে চললেন, তার খানিক আমি বুঝলাম, খানিক হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো , শুধু দেখতে পেলাম ষাট ছুঁতে যাওয়া এক বাগদত্তার স্বপ্নবুননের রংধনুর রঙ ।

 

ওনাদের যার যার ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে নিজেদের মত জীবন যাপন শুরু করেছে, তাদের এখনো সুখবর টা জানাননি তারা। সময়মত নিশ্চয়ই জানাবেন, কিন্তু জীবনের হাজারো দায়িত্ব পালন শেষে এই বেলাতে তাদের নিজের সুখ সন্ধানের সবটুকু অধিকার তাদের রয়েছে। আমি শুধু মুগ্ধতা নিয়ে তাদের ভালবাসা/ জীবন কাহিনী শুনে যাচ্ছিলাম ।

এক সময় উনি আমাকে আমাদের সিটের অপরদিকের জানালার দিকে তাকিয়ে দেখতে বললেন ,  “ Look! What did he write there ! “

দেখলাম জানলার বাইরের দিকে ধুলোমাখা কাঁচের ওপর একটু যেন আঁকিবুঁকি কাটা। খেয়াল করে দেখতেই বুঝলাম,  তাদের দুজনের নামের আদ্যক্ষর লেখা।  ভদ্রলোক দারুণ রোমান্টিক মনে হলো।  একটি হৃদয়ের চিহ্ন এঁকে দিয়েছেন ধুলোমাখা জানালার কাঁচের ওপর তার মাঝেই দুটো বর্ণ , মনে হচ্ছে যেন একটি বড় হৃদয়ের বেড়ির ভেতর সুরক্ষিত দুটো  ছোট্ট হৃদয় ।

বাগদত্তার সিটের অপরদিকের জানালায় একেছেন যাতে গোটা পথটা ভদ্রমহিলা দেখতে দেখতে যেতে পারেন যে ধুলোমাখা ঘোলাটে পটভুমিতেও তাদের নাম লিখে দিতে জানেন তিনি। জীবন সায়াহ্নে এসে আমাদের পটভূমিও তো ঘোলাটে হয়ে ওঠে, সে ধূলো ঝাড়তে চাই অমোঘ প্রেম , জাগতিক চাওয়া পাওয়ার রাংতা কাগজ দিয়ে যে প্রেম মোড়া নয়।

নামের আদ্যক্ষর লেখা, হৃদয় চিহ্ন দিয়ে তা বেঁধে দেওয়া, অনেকের কাছেই অমন প্রকাশ এক্কেবারে সেকেলে লাগবে।  আমার কিন্তু ভীষণ ভাল লেগেছে। ভালবাসার প্রকাশে বা ধারনে সেকালের ছাপ মন্দ লাগেনা । একালের অন্য সব কিছুর মতো প্রেমেও বড় অস্থিরতা দেখতে পাই।

আমাদের ষ্টেশনে এসে পড়লো গাড়ি, নেমে গেলাম। আমার কয়েক ঘন্টার সহযাত্রীর ফুরফুরে ভাললাগার গল্প আমাকে আরো খানিকটা সময় আবেশিত করে রাখলো। পরমকরুনাময়ের কাছে  মনে মনে প্রার্থনা করলাম , “ ওদের অপরাহ্নের এই ভালবাসাতে তুমি এসিড বৃষ্টি হতে দিও না প্রভু, মাঝে মধ্যে হালকা তপ্ত প্রবাহ যদিও বা থাকে বাকিটা থাকুক শান্তির ধারা। “

যুথিকা গোলদার
জর্জিয়া , ইউ এস

Facebook Comments

You may also like

মা আমার

কেন যে মা তোমার মুখে এত মধু মিষ্টি