সমসাময়িক প্রসঙ্গ ও আত্মজিজ্ঞাসা

সমসাময়িক প্রসঙ্গ ও আত্মজিজ্ঞাসা

0

কাজী সুলতানা শিমি: সিডনীতে এক নাগরিক সম্বর্ধনায় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের একটা কথা আমার সময়ে সময়ে খুব মনে পড়ে। সেখানে তিনি চমৎকার কিছু কথা বলে গেছেন যা উপস্থিত সবাই খুব মনযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি বলেছিলেন, আপনারা ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তবে ফিরে আসুন প্লীজ। আপনারা একে অপরের সাথে সামনা-সামনি কথা বলা শুরু করুন।রাগারাগি, হাসাহাসি কিংবা সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে আবার মানবিকতাকে ফিরিয়ে আনুন। সম্প্রতি ডেইলি টেলিগ্রাফে সিডনী ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর মাইকেল স্পেন্স ঠিক এই কথাগুলোই যেন বলেছিলেন আবার। বলছিলেন আমরা পরস্পরের সাথে কথা বলতে ভুলে যাচ্ছি। আমাদের কিছু জানানোর বা বলার মাধ্যম হিসেবে এখন আমরা কেবল সোশ্যাল মাধ্যম কিংবা নিজেদের পছন্দসই অন্যকোন মাধ্যম ব্যাবহার করছি। আর যাদের মত নিজেদের মতের সাথে মিলছে শুধু তাদের সাথেই আমরা যোগাযোগ রাখি অন্যদের সহ্য করতে পারছিনা। আমরা ভুলে যাচ্ছি কি করে অনৈক্যর সাথে পরিশীলিত ভাবে সহবস্থান করতে হয়’। সত্যি বলতে কি বাস্তবে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু একটা ঘটলেই আজকাল আমরা যাচাই বাছাই না করেই কোন একটা মন্তব্য করে বসি। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে করা মন্তব্য নিয়ে পরিচিত অপরিচিত অনেকেই তাৎক্ষণিক ভাবে তা নিয়ে বিরাট গবেষণা ও হুলস্থল বাঁধিয়ে বসেন। এখন ভার্চুয়াল মাধ্যমের কোন সীমা পরিসীমা নেই। কিন্তু অনেক সময় সেটা হয় আতঙ্কের, ক্ষেত্র বিশেষে ভয়ঙ্কর ও বটে।

খুব সম্প্রতি ইস্টার সানডেতে শ্রীলংকায় আত্নঘাতি বোমা হামলার বিষয়ে একটা বিষয় উল্লেখ করি। শ্রীলংকায় আত্নঘাতি বোমা হামলার পর সকল সোশ্যাল মিডিয়া তখন রীতিমত তোলপাড়। ফেসবুক তো আরও একধাপ এগিয়ে। খুব কম সংখ্যক মানুষ পাওয়া যাবে যারা কোন প্রতিক্রিয়া জানাননি। কেউ কেউ আবার সারারাত জেগে এ নিয়ে বিশেষ স্ট্যাটাস দিয়ে রীতিমতো গবেষণায় বসে গেছেন, কে কি মন্তব্য করলো এবং তার যথোপযুক্ত রিপ্লাই কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সাধারণত কোন ঘটনা ঘটার সাথে সাথে আমি কোন  প্রতিক্রিয়া জানাই না, বা স্ট্যাটাস দিইনা। পরের ঘটনার জন্য অপেক্ষা করি। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, আমি ঘটনাটিতে দুঃখিত কিংবা আনন্দিত হইনা। আমি অপেক্ষা করি, ধৈর্রয ধরি এবং সহমর্মিতা জানাই। তবে একটু পরে। ততোক্ষণে আসল ঘটনার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।

শ্রীলংকায় আত্নঘাতি বোমা হামলার ব্যাপারেও প্রথমে অপেক্ষা করলাম। অনেকের ভাবনা চিন্তা এবং স্ট্যাটাস গুলোতে চোখ রাখলাম। এ নিয়ে অতিশোকে কেউ কেউ আবার নিজের বাগানের ফুলের ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে লিখেছেন শ্রীলংকায় আত্নঘাতি বোমায় নিহতদের স্মরণে! সেখানে আবার অনেকেই লাইক ও কমেন্টে সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। সেইসাথে আমন্ত্রণ নিমন্ত্রন আর বেড়ানো ঘুরাঘুরি নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত, পাশাপাশি সেসবের ছবিও দিয়েছেন। এ জাতীয় ফেসবুকি হিপক্রাসিতেই কি আমাদের দায়বদ্ধতা শেষ! আসলে এটা  কতোটা গ্রহণীয়!

চারদিকে ভীষণ হাহাকার শ্রীলংকায় আত্নঘাতি বোমা হামলা নিয়ে, তখন বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেকের মতামত দেখা ও জানার পর একটি শোক কিংবা সহমর্মিতার আয়োজন করা যারা কিনা সেটা নিয়ে ভাববার কথা বলেছিলাম। প্রতীকী কিছু একটা অন্ততঃ করা। সিডনীতে বিভিন্ন সংগঠন করেন, নেতা, সাংবাদিক, সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন কিংবা প্রগতিশীল বলে দাবী করেন তাদের কয়েকজনের সাথে ফোনে আলাপও করলাম। মজার ব্যাপার হলো যারা এতদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ করে ফেসবুকে রাতের পর রাত কিংবা দিনের পর দিন মমতা ও মানবতার বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন তারা কেউই এগিয়ে এলেন না। বরং কোন একটা অজুহাত খুঁজে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন। অনেকটা সরাসরি ভাবেই। এখনেই উৎকণ্ঠা। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আসলে আপনি নিজে কতোটা সৎ ও শুদ্ধ! আপনার ভূমিকা কি কেবল ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ!

বিষয়টা এখানেই শেষ নয়। এর কিছুদিন পর সিডনীতে একটি বেসরকারি সামাজিক সংগঠন ‘কমিউনিটি  মাইগ্র্যান্ট রিসোর্স সেন্টার’ শ্রীলংকায় আত্নঘাতি বোমা হামলায় নিহতদের স্মরণে একটি স্মরণ সভার আয়োজন করেছিলো। জানানো হয়েছিলো সেইসব সুশীল, প্রগতিশীল, বিজ্ঞজন ও মর্মাহতদের। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় সেখানেও কেউ এলেন না। নিদেন পক্ষে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে কিংবা একটি শোকবার্তা লিখার মতো সময় ও ইচ্ছা তাদের হলোনা। অথচ তারাই ফেসবুকে পৃথিবীর সমস্ত মানবতা উদ্ধার করে ফেলেছিলেন রাতজেগে স্ট্যাটাস আর ছবি দিয়ে। যারা জানেননি তাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু যারা জানেন এবং জানানো হয়েছিলো তারা কি নৈতিক দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন এ ব্যাপারে! না। করেন নি। এই হলো বাস্তবতা।

অন্যকে দোষারোপ করে কিংবা নিজের দ্বায়িত্ব এড়িয়ে সমাজ পরিবর্তন করা যায়না। যার যার নিজের জায়গা থেকে যতোটুকু পারা যায় সেটুকু তো অন্ততঃ করতে হবে। শুধু জ্ঞানী জ্ঞানী কথাবার্তা আর স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের দায়বদ্ধতা এড়ানো যায় কিংবা অপরের সমীহ পাওয়া যায়। কিন্তু সবকিছুর আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি নিজে অন্তর্গতভাবে কতোটা সৎ, সাহসী ও শুদ্ধ। কেনোনা আত্নশুদ্ধির বিকল্প কিছু নেই।

কাজী সুলতানা শিমি                লেখক ও সাংবাদিক

 

Facebook Comments

You may also like

শেখ হাসিনাকে যে কারনে তারা হত্যা করতে চেয়েছে ২১ আগষ্টে

ফজলুল বারী:দুই হাজার চার সালের ২১ আগষ্টের জনসভার