এই ভারতকে আমরা চিনিনা

এই ভারতকে আমরা চিনিনা

0

ফজলুল বারী:সোমবার ভারতের লোকসভায় পাশ হওয়া নাগরিকত্ব বিল মূলত আসামের ঘোষিত নাগরিকপঞ্জিরই বর্ধিতাংশ। আসামে নাগরিকপঞ্জি ঘোষনার পর দিল্লীর শাসকরা এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। কারন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া দরিদ্র মুসলমানদের চিহ্নিত-টার্গেট করে ওই নাগরিকপঞ্জির ব্যবস্থা করা হলেও ঘোষিত তালিকায় দেখা যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বেশি। মুখে কিতাবে বাংলাদেশ-পাকিস্তান-আফগানিস্তান থেকে নির্যাতিত হিন্দু-শিখ-খ্রিস্টানদের কথা বলা হলেও অমিত বাবুদের মনে মধ্যে কিন্তু বাংলাদেশ! এরজন্যে এনআরসি শুরু করা হয়েছে আসাম থেকে। আসামের এনআরসি দেখে তাদের টনক নড়ে! খুব স্বাভাবিক ভারতে বাংলাদেশ থেকে হিন্দু গেছেন বেশি। যেটা পশ্চিমবঙ্গে হাত দিতে গেলে আরও জটিল চেহারা বেরুবে।

অতএব মূলত প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যাওয়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সুরক্ষা দিতেই নতুন আইনের ব্যবস্থা করেছে ভারতের চলতি বিজেপি সরকার। বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের মাধ্যমে যেমন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যালঘু চিহ্নিত এবং দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে, নতুন নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে নিজের দেশের মুসলমানদেরও  সঙ্গে একই অবিশ্বাস্য আচরন করলো দিল্লী। বিষয়টি আজকের যুগের জন্যে কদর্য। কারন যে ভারত নতুন পরাশক্তি হতে চায় সে দেশটির ধর্মীয় বিভাজন চিন্তাটি পরাশক্তি স্বপ্নের  সঙ্গে সমার্থক নয়। অন্তর্ঘাতমূলক। এই ভারতকে আমরা চিনিনা। এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম পানিপড়ার  তখন বিরোধিতা করেছিল আওয়ামী লীগ-বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা ওটাতে হাত দেয়নি। হাত পোড়াবার ভয়ে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত রাষ্ট্রধর্মের সংবিধান সংশোধনীর নানা অংশ অবৈধ ঘোষনা করলেও রাষ্ট্রধর্ম অংশে হাত দেয়নি। কারন ওই বিচারপতিরাও এটা ধরে বেহেস্তে যেতে চেয়েছেন! ভারতের বিজেপির জোটের বাইরের দলগুলো এখন আইনটির বিরোধিতা করলেও দেশটায় আগামীতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে একই কারনে হয়তো এতে তারা হাত দেবেনা। এভাবে আইনটি যদি টিকে যায় এর প্রতিক্রিয়া হবে সুদূরপ্রসারী। এটার দেখানো পথে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ আরও বেড়ে যেতে পারে।

অথচ এই ভারতকে আমরা চিনতাম মহান এক ভারতমাতার মহিমায়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ফর্মূলায় হিন্দু-মুসলিম ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলেও শুরু থেকে পাকিস্তান ধর্মীয় মৌলবাদ আর সামরিকতন্ত্রের পথে চললেও ভারত চলেছে গণতন্ত্র আর ধর্ম নিরপেক্ষতার ফর্মূলায়। ব্রিটিশ ফর্মূলায় হিন্দুদের দেশ হিসাবে ভারত স্বাধীন হলেও দেশটার প্রভাবশালী মুসলিম জনগোষ্ঠী দাপটের সঙ্গেও ধর্ম নিরপেক্ষ দেশটায় বসবাস করে আসছেন। বলিউড বাদশাহদের বেশিরভাগ এখনও মুসলমান। দিল্লীর ক্ষমতা দখলের গুরুত্বপূর্ন রাজ্য উত্তর প্রদেশ প্রভাবশালী মুসলমানদের কুরুক্ষেত্র। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের চাইতে বেশি সংখ্যক  মুসলিমের বসবাস ভারতে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ভারত মুসলমান রাষ্ট্রপতিও পেয়েছে। মুদ্রার অপর পিঠে একজন হিন্দু রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তান-বাংলাদেশে আজও অকল্পনীয়। ১৯৭১ সালে কংগ্রেস এবং ইন্দিরা গান্ধী দিল্লীর ক্ষমতায় থাকার কারনে বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় ও মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছিল। হাস্যকর বিষয় নাগরিকত্ব বিল উপস্থাপন কালে হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় ভিত্তিতে দেশভাগের জন্যে কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা অমিত শাহ।

তবে বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থা নিয়ে তিনি কিছু মন্তব্য করেছেন যা অপ্রিয় হলেও সত্য। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ-ধান্ধার তাদের নতুন আইন বাংলাদেশের হিন্দুদের সুরক্ষা দেবেনা। বিপদ বাড়াবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন বাঁচাতে যত শরণার্থী ভারতে গেছেন এর বড় অংশ ছিলেন হিন্দু। মুক্তিযুদ্ধকে ভারত আর হিন্দুদের ষড়যন্ত্র দাবি করে পাকিস্তানিরা তখন হিন্দু বাড়ি-সম্পত্তি বেশুমার পুড়িয়েছে। ধংস করেছে। দেশে থাকা মুসলমানরা তখন দল বেঁধে লুট করেছে হিন্দু বাড়ি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মন্দির ওই সময়ে লুট অথবা ধংস হয়েছে।

তখন প্রবাসী বাংলাদেশি নেতৃত্ব ভারতকে আশ্বস্ত করেন, স্বপ্নের নতুন দেশ হবে ধর্ম নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলাম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানে কোন ভেদাভেদ থাকবেনা নতুন দেশে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে শরণার্থীরা বিশেষ করে হিন্দু শরণার্থীরা দেশে ফিরে যাবে নিরাপদে থাকবে, এই ধারনা-আশা থেকেও দিল্লী তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতায় হাত বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশের পচাত্তর পরবর্তী নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধের এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশাসঘাতকতা করেন। দুই অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়া-এরশাদ ছিলেন এর হোতা। কিন্তু হাসিনা-খালেদা দেশকে সে পথ থেকে ফেরাননি। সে কারনে ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় স্বাধীন দেশটার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষজন এখনও ভারত ও হিন্দু বিরোধী। গত পঞ্চাশ বছরেও নীরবে হিন্দুদের দেশত্যাগ থামেনি। গ্রামে-শহরে হিন্দু বাড়ি-সম্পত্তি দখল-কমদামে কিনে নিতে আওয়ামী নেতা-প্রভাবশালীরাও কম যাননি। সে কারনে এই যুগের সব হিন্দু নতুন প্রজন্ম আর আগের মতো চোখ বন্ধ করে সবাই আওয়ামী লীগ বা নৌকা মার্কা না। কিন্তু প্রতিটি ভোটের পর নৌকা মার্কা চিহ্নিত করেই তাদের ওপর হামলা হয়।

বাংলাদেশের মুসলমান যারা সুবিধামতো ভারত গেছেন তারা মূলত অর্থনৈতিক শরণার্থী। এদের সিংহভাগ নদী ভাঙ্গা সর্বশান্ত গরিব মানুষ। সামর্থ্যবানরা উন্নত জীবনের আশায় নানাভাবে গেছেন ইউরোপ-আমেরিকায়। গরিব মানুষেরা সীমান্ত পেরিয়ে গেছেন ভারতে। যেমন উন্নত জীবনের আশায় দুনিয়ার দেশে দেশে সবচেয়ে বেশি গেছেন ভারতীয়রাই। আবার ভারতে যত চাপের মধ্যে থাকুন না কেনো কোন ভারতীয় মুসলমানের বাংলাদেশে আসার কোন নজির নেই। কিন্তু পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ হিসাবে ভারত যেখানে এ অঞ্চলেরও নেতৃত্ব দিতে চায় সেখানে বড় হিসাবে মানুষের প্রতি সমান সুবিচারে দেশটি ব্যর্থ হয়েছে। ভারতে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে এ দলটি ক্ষমতায় এলেও মাঝে নরেন্দ্র মোদীকে একজন আধুনিক সংস্কারপন্থী নেতা হিসাবে ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু নতুন নাগরিকত্ব আইন প্রকাশ করেছে কদর্য এক স্বরূপ। ভারতের এই নেতৃত্ব মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখেনা, হিন্দু-মুসলমান হিসাবে দেখে। তাদের হিন্দুত্ব বাংলাদেশে বিশেষ লোকজনের মুসলমানিত্বকে উস্কানি জোগাবে। এখনও যত দেশপ্রেমিক হিন্দু আছেন বাংলাদেশে, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নানা আক্রমন স্বত্ত্বেও জন্মভূমি বাংলাদেশ ছাড়তে যারা চাননা, ছেড়ে যাবেন বলে ভাবেনওনা, তাদের নতুন আক্রমনের মুখে ফেলতে পারে। হুশিয়ার বাংলাদেশ। সজল-আশীষ-দীপক-মৃণাল এরাই আমার শৈশবের বন্ধু, মানস-তুশীষ-দেবাশীষ-পম্পারাই আমার পাতলাখান লেনের ভালোবাসা, ভারতীয় অমিত শাহদের ষড়যন্ত্রে আমাদের জন্মভূমিকে অশান্ত করতে দেবোনা। আমার এখনও বিশ্বাস ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টে হিন্দুত্ববাদী এই আইন টিকবেনা।

ফজলুল বারী
fazlulbari2014@gmail.com

 

 

 

 

 

Facebook Comments

You may also like

ই-পাসপোর্ট ইভিএম এনালগ ডিজিটাল বাংলাদেশ

ফজলুল বারী:সিডনির নরওয়েস্ট এলাকায় আমি কাজ করি। এটি