গরিব মানুষজনের নাগরিকত্ব অস্বীকার করবেননা

গরিব মানুষজনের নাগরিকত্ব অস্বীকার করবেননা

0

ফজলুল বারী:প্রিয় প্রজন্ম ছেলেটা সাইপ্রাসে গিয়ে বিপদে পড়ে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে আমাকে ফোন করে কাঁদে আর সাহায্য চায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে তার বাড়ি। আমি কল রিসিভ করে তার সঙ্গে রাগারাগি করি। কারন ছেলেটি সাইপ্রাস যাত্রার আগে যখন আমার সঙ্গে পরামর্শের জন্যে যোগাযোগ করেছিল আমি তাকে এভাবে অবৈধপথে যেতে নিষেধ করেছিলাম। সোশ্যাল মিডিয়ার কারনে প্রিয় প্রজন্ম এমন অনেক ছেলেমেয়ের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন আমার যোগাযোগ হয়। তাদের স্বপ্ন-রুটি-রুজি এমন কি প্রেমের সম্পর্ক নিয়েও শেয়ার করে আমার সঙ্গে। এই ছেলেটিকেও হেল্প করতে আমি সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নেই। সাইপ্রাসের তুর্কি অংশে প্রবাসী বাংলাদেশি কেউ থাকলে ছেলেটির জন্যে সাহায্য চেয়ে একটা পোষ্ট দেই ফেসবুকে। তখন মৌলভীবাজারের রাজনগর এলাকার বাসিন্দা ইতালি প্রবাসী এক প্রিয় প্রজন্ম যোগাযোগ করে বলে ছেলেটি যদি সাইপ্রাসের গ্রীক অংশে চলে আসতে পারে তাহলে তাকে সহায়তা করা যেতে পারে। কারন ইতালি প্রবাসী ছেলেটি এক সময় গ্রীক সাইপ্রিয়টের নিকোশিয়ায় থাকতো।

আমার কথায় ছেলেটি নিকোশিয়ায় আসে। কিন্তু ইতালির ছেলেটা তাকে সাহায্য করতে পারেনা। আসলে বিদেশে কাজ পাবার প্রথম যোগ্যতা হলো ভিসা স্ট্যাটাস। বাংলাদেশ জুড়ে প্রচলিত ভুল এক ভিসার নাম ফ্রি ভিসা! ফ্রি ভিসায় কোথাও গেলে নাকি যে কোন কাজ পাওয়া যায়-করা যায়! আসলে পৃথিবীতে ফ্রি ভিসা নামের কোন ভিসা নেই। টুরিস্ট ভিসাকে ফ্রি ভিসা নাম দিয়ে দালালরা শিকারদের নানান দেশে নিয়ে ছেড়ে দেয়। অথচ এসব টুরিস্ট ভিসার ফী সর্বোচ্চ ১৫-২০ হাজার টাকা। এই ভ্রমন ভিসায় গিয়ে আপনি ভারতে গিয়েও কাজ করতে পারবেননা। এই ছেলেটিও দালালের মাধ্যমে গিয়েছিল সাইপ্রাসে। এরপর গ্রীক সাইপ্রাসে এসে সে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্যে আবেদন করে। বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন মানে দেশের বিরুদ্ধে যত খারাপ বলা যায় তাই বলা হয়। কিন্তু এতেও সহজে কোথাও আশ্রয় পাওয়া যায়না।

নিকোশিয়ায় আসার পর ছেলেটি একটি সিরিয়ান রেষ্টুরেন্টে কাজ পেয়েছিল। খুশিতে ছেলেটি আমাকে নক পেয়ে চাকরি পাবার খবর দেয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে তার চাকরিটি যায়। আবার কান্নাকাটি। কান্না থামাতে আমি কিছু টাকা পাঠাই। চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক রাজনীতিক আমার লেখা পড়ে কিছু টাকা দেন। ছেলেটির কিছুদিন নিরাপদে চলার একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়। মাঝে আমার ফেসবুক একাউন্ট না থাকায় অনেকের মতো ছেলেটির সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আজ অনেকদিন পর ছেলেটির সঙ্গে কথা হয়। এরমাঝে সে একটি ফলের দোকানে ভালো একটি কাজ পেয়েছে। ইহুদি মালিকানাধীন দোকানি তাকে মাসে প্রায় নয়শ ইউরো দেন। তাই সে এখন মোটামুটি ভালো আছে। মজা করে বলি, ইহুদি মালিকানাধীন দোকানে কাজ করো। গ্রামের হুজুর শুনলে কী বলবে। কথাটি শুনে ছেলেটি হাসে। ছেলেটি বললো তার ভিসার মেয়াদ আছে আর ছয় মাস। এরপর সেখানে থাকতে চাইলে তাকে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করতে হবে। কিন্তু সেটিও বেশ ব্যয়বহুল। জিজ্ঞেস করি মেয়ে কোন দেশের? বললো রুমানিয়া-লাটভিয়া এমন নানা দেশের মেয়ে। এই হচ্ছে অবৈধভাবে বিদেশ গেলে দেশের নানান তরুনদের হালহকিকত। দেশ নানা কারনে স্বপ্ন দেখাতে পারেনা বলে বাংলাদেশের ছেলেরা এমন অনিশ্চিত পথে বিদেশ যায়।

আরব আমিরাতে গত ৬-৭ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ আছে। কিন্তু মরুর দেশটায় লোক যাওয়া বন্ধ হয়নি। দালালরা টুরিস্ট-ভিজিট ভিসায় লোকজনকে দেশটায় নিয়ে যাচ্ছে। এরপর অনেকের ভিসা স্থানান্তর করা হচ্ছে ইনভেস্টর ভিসায়। এটা বিনিয়োগকারীদের ভিসা। এ ভিসায় কারও কাজের অনুমতি নেই। কিন্তু ভিসাটি যেহেতু তিন বছরের, অনেকে লুকিয়ে কাজ করে। আবার অনেক বাংলাদেশি এদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে মজুরি দেয়না। মরুর দেশে যাওয়া বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের হাহাকারের কান্না পৌঁছে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। আরব আমিরাত থেকে আবার ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার সহ সুলভ নানান অনলাইন মাধ্যমে কল করে কথা বলা যায়না। কিন্তু বুদ্ধিমান পোলাপানদের কে আটকায়! এরা ফোন সেটে ইনস্টল করে নিয়েছে ভিপিএন সুবিধা। কথা বলার আগে বলবে, দাঁড়ান ভাই, ভিপিএন থেকে কল দেই। কথা বলা মানে নানান কষ্ট শেয়ার করা। আমার লেখা পড়ে দুবাই প্রবাসী এক ভদ্রলোক এমন বিপদগ্রস্ত একটা ছেলেকে দু’দফায় এক হাজার দিরহাম দিয়েছেন। আমিও টাকা পাঠিয়েছি দু’দফায়। এমন বিপদগ্রস্ত ছেলেদের আবার দুই-তিন মাস সাপোর্ট দিলে তারা সংগ্রামে সাহস পায়। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু এরা যে একজন-দু’জন না। হাজারে হাজার। আপনার ইচ্ছা করবে সবাইকে সহায়তা করতে। কিন্তু সামর্থ্যের অভাবে পারবেনা। অসহায়ভাবে কাঁদবেন। কারন আমাদের কারও সামর্থ্যই অফুরান নয়।

সৌদি আরব-মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাজার হাজার অবৈধ লোকজন। সৌদি আরব থেকে প্রায় লোকজনকে ধরে বিমানে তুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মালয়েশিয়া থেকে অবৈধদের আনতে বিমান ভাড়ায় সরকারের তরফ থেকে দশ হাজার টাকা ভূর্তকি দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমন বিদেশে অবৈধ বাংলাদেশি বাংলাদেশ সরকার বা জনগনের কাছেও খুব স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অবৈধ ইস্যুটি যদি ভারতের সঙ্গে হয় তখন হয়ে যায় স্পর্শকাতর! বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে একবার ভারত থেকে পুশব্যাকের ঘটনা ঘটলো। দিল্লীর বস্তিগুলো থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের ধরে বাংলাদেশের সীমান্তে ঠেলে দেয়া হতো। বাংলাদেশ সরকার থেকে দাবি করা হতো এরা বাংলাদেশি নয়।

কিন্তু আমি নিজে যশোরে সীমান্তের নোম্যানস ল্যান্ডে থাকা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি এরা আসলে গরিব বাংলাদেশি। এরা এতো গরিব যে কাজের জন্যে ঢাকা আসার চেয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত চলে যাওয়া তাদের জন্যে অনেক সহজ। নোম্যানস ল্যান্ডে গিয়ে এমন লোকজনকে বললাম বিএসএফকে বলে তাদেরকে আবার ভারতে ঢুকিয়ে দেবো কিনা। তারা তখন বলে নারে ভাই, নিজের দেশে চলে এসেছি। কাজ করতে গিয়েছিলাম। ওরা যখন ধরে পাঠিয়ে দিয়েছে তখন আর তাদের দেশে যাবোনা। এমন তিন-চার দিন নোম্যানস ল্যান্ডে কাটিয়ে রাতের আঁধারে যশোর-খুলনার গ্রামের গরিব লোকগুলো আবার যারযার গ্রামে গিয়ে মিশে গেছে। তখনও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছিল ভারত বেআইনিভাবে ভারতীয় বাংলাভাষীদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে! গরিব জনগনকে এভাবেই অস্বীকার করে একটি রাষ্ট্র!

ভারতের সঙ্গে এই সমস্যাটি আবার দেখা দিয়েছে। এনআরসির ভয়ে কাজের আশায় ভারতে যাওয়া বাংলাদেশিরা এখন হয় নিজেরা দেশে ফিরে আসছেন অথবা ভারত তাদের ঠেলে দিচ্ছে। এমন কয়েকশো মানুষকে সীমান্তে গ্রেফতারও করা হয়েছে। আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন সাহেব বলছেন, বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো হওয়াতে ভারতীয়রা কাজের জন্যে বা ফ্রি খাওয়ার জন্যে বাংলাদেশে ঢুকছে! মন্ত্রী হলেই কোন একজনকে এমন হাস্যকর কথা বলতে হবে নাকি!

যারা আসছে বা যাদের ঠেলে দেয়া হচ্ছে তাদের ইন্টারভ্যু নিয়ে দেখুন-এরা স্রেফ গরিব বাংলাদেশি। কাজের জন্যে এখানকার কেউ সাইপ্রাস যায় কেউ দুবাই-মালয়েশিয়া যায়। আর যারা এমন সামর্থ্যহীন তারা সীমান্ত পেরিয়ে চলে যায় ভারতে। গরিব মানুষজনের কী দেশ কী সীমান্ত! ইসরাইলের ভিতরেও বাংলাদেশি আছে জানেন? যারা মিসর-জর্দান থেকে সেখানে গেছে। ক্ষুধা যে কোন সীমান্ত মানেনা। তাই প্লিজ নিজের দেশের গরিব মানুষজনের নাগরিকত্ব অস্বীকার করবেননা। পারলে এমন দেশ বানান যাতে এর কোন নাগরিক অন্য কোনদেশে না যায় বা যেতে না হয়। আসামে যে গরিব বাংলাদেশিরা গেছে এটাও সত্য বাস্তব। নদী ভাঙ্গা অনেক সর্বশান্ত মানুষজনও গেছে। গরিব মুসলমান গেছে কাজ আর আশ্রয়ের আশায়। হিন্দুদের বেশিরভাগ গেছেন ধর্মীয় এবং জন্মভিটায় নানান অনিশ্চয়তার কারনে। যুগেযুগে অভিবাসন হয় সময়ের আর জীবিকার প্রয়োজনে। তাই খাগড়াছড়িতে যেমন আসাম বস্তি আছে, আসামে তেমন আছে নোয়াখালী বস্তি। কাজেই প্লিজ, বাস্তবতা বুঝেশুনে মানবিক হোন।

ফজলুল বারী
fazlulbari2014@gmail.com

Facebook Comments

You may also like

দিল্লীর তবলিগ জামাতের মুসলমানরা এখন ভারতের মানুষের করোনা ভীতির কাঠগড়ায়

ফজলুল বারী :করোনার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিত একটি