কেউ দাঁড়ায়নি মুশফিকের পাশে!

কেউ দাঁড়ায়নি মুশফিকের পাশে!

0

ফজলুল বারী:পাকিস্তান যেতে রাজি না হওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের দীর্ঘদিনের নিবেদিতপ্রান  খেলোয়াড় মুশফিককে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধের তৃতীয় ওয়ানডে দলে রাখা হয়নি। প্রধান নির্বাচক বলেছেন মুশফিককে বিশ্রাম দেয়া হয়েছে। ডাহা মিথ্যে কথা। শাস্তি দেয়া হয়েছে মুশফিককে। বিসিবির একনায়ক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের কথা না শোনার শাস্তি! এমনকি মাশরাফির অনুরোধও রাখা হয়নি। অধিনায়ক হিসাবে মাশরাফির শেষ ম্যাচটিতে খেলার ইচ্ছা ছিল মুশফিকের। মাশরাফিও অনুরোধটি করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অনুরোধ রাখেননি পাপন। মাঠের সাইড লাইনে বসে মাশরাফির অধিনায়কত্বের শেষ ম্যাচ দেখেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের নিঃসঙ্গ শেরপা মুশফিক। এর নিশ্চয় কোন না কোন ফোরামে একদিন বিচার হবে।

জাতীয় ক্রিকেট সংস্থা বিসিবি মূলত এখন পাপন এন্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিঃ! প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত আইভি রহমানকে মন থেকে শ্রদ্ধা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূলত এই শ্রদ্ধা থেকেই তাদের ছেলে পাপনকে এমপি, বিসিবি প্রধান করেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাঁর দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে যা খুশি করে যাচ্ছেন পাপন। ক্যাসিনো কান্ডে যাকে যেখানে পাওয়া গেছে তাকেই বহিষ্কার করা হয়েছে। শুধু বিসিবির লোকমান ছাড়া। খালেদা জিয়ার সাবেক দেহরক্ষী লোকমান পাপনের বন্ধু। এই যোগ্যতায় তাকে বিসিবির অন্যতম পরিচালক করা হয়েছে। মোহামেহান ক্লাবে ক্যাসিনোর হোতা লোকমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু পাপন তাকে বিসিবিতে আগলে রেখেছেন। এরমাঝে বিদেশে পাপনের ক্যাসিনোয় জুয়া খেলার ছবি-ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে বিব্রত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু জিল্লুর রহমান, আইভি রহমানের প্রতি দূর্বলতায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজনকে ক্ষমতা যেমন দেন, ক্ষমতা কেড়েও নেন। চট্টগ্রামের দাপুটে মেয়র আ জ ম নাছিরের বেলায় এটি সর্বশেষ দেখা গেছে। পাপন সাহেব যেন এটি ভুলে না যান।

পাকিস্তান সফর নিয়ে শুরুতেই বলা হয়েছিল খেলোয়াড়দের যার ইচ্ছা পাকিস্তান যাবে, যার ইচ্ছা যাবেনা। এ নিয়ে কাউকে কোন জোরাজুরি করা হবেনা। মুশফিক পারিবারিক কারনে তখনই জানিয়ে দেন তিনি পাকিস্তানে যাবেননা। কিন্তু দল পাকিস্তান গিয়ে গো হারা হারে। যে অবস্থার ভিতর টানাহেঁচড়ায় যেভাবে ক্রিকেটারদের পাকিস্তানে নেয়া হয়েছে তাতে এমন ফলাফল অবধারিতও ছিল। ড্যানিয়েল ভিট্টরি সহ কোচিং স্টাফের অনেককেও পাকিস্তান নেয়া যায়নি। কিন্তু পাকিস্তানে দলের খারাপ ফলাফলে বিসিবি বসের বিবেচনায় সব দোষ গিয়ে পড়ে মুশফিকের ওপর! এরমাঝে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে মুশফিক ডাবল সেঞ্চুরি করলে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন প্রকাশ্যেই বলেন তিনি আশা করছেন শেষ টেস্টে মুশফিক পাকিস্তান যাবেন। কিন্তু ক্রিকেটতো ভদ্রলোকের খেলা। বিসিবি সভাপতি দলের একজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের সঙ্গে ভদ্রতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছেন।

সিলেটে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সিরিজ জয়ের পর প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, প্রধান কোচ রাসেল ডোমিঙ্গো মুশফিককে ডেকে নেন। সেখানে বলা হয় তাঁকে পাকিস্তান সফরে যেতে হবে। পাকিস্তান না গেলে তাকে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে তৃতীয় ওয়ানডে দলে রাখা হবেনা। এটি বোর্ড সভাপতির নির্দেশ। এমন অভাবিত চাপে বিব্রত-হতভম্ভ হয়ে যান মুশফিক। এভাবে কেউ তাকে চাপ সৃষ্টি করবে তা তিনি ভাবতে পারেননি। সেখান থেকে চলে আসেন মুশফিক। কিন্তু খবরটি গোপন থাকেনি। অনেকে এরজন্যে নান্নু-ডোমিঙ্গোকে দায়ী করেছেন। এটা তাদের ভুল। নান্নু-ডোমিঙ্গো এখানে পাপনের কর্মচারীর ভূমিকা পালন করেছেন। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। বিসিবিতে এখন সবাই পাপনের কর্মচারী। খেলোয়াড়দেরও পাপন তার কর্মচারী মনে করেন। ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটে বাংলাদেশে এখন কোন ভদ্রজনিত পরিবেশ নেই।

সে কারনেই কিছুদিন আগে খেলোয়াড়দের বিদ্রোহ হয়েছে। সেই বিদ্রোহের পর পাপন অবাক হবার কথা জানান। তার কথা খেলোয়াড়দের সঙ্গে তার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। খেলোয়াড়রা এসব বললেই তিনি দিয়ে দিতেন। আন্দোলন করতে হতোনা। বিসিবিতে এখন যে একটি দমবদ্ধ পরিবেশ, এর প্রকাশ ছিল সেই আন্দোলন। সেই আন্দোলনের কারনে জানা যায় দেশে-বিদেশে বিসিবির পরিচালকরা কত ভাতা পান, আর খেলোয়াড়রা কত পায়। অথচ খেলোয়াড়রা খেলে বলেই ক্রিকেটে এত অর্থ। বেশুমার লুটপাট চলছে সেখানে। অথচ খেলোয়াড়রা না খেললে কর্মকর্তারা জিরো। একের পর এক নানা ঘটনায় প্রকাশ পাচ্ছে বিসিবিতে এবং দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে একজন জুয়াড়ি সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতা চরম রূপ নিয়েছে। ভদ্রলোকের খেলার জগতের পরিবেশটি অভদ্রোচিত।

মাশরাফি বিন মোর্তজার বিদায় নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল সেটি এর অন্যতম নজির। মাশরাফির বয়স হয়েছে। তাঁকে সরে যেতেই হতো। কিন্তু তাকে নিয়ে এই করবেন সেই করবেন, এটা কী পাবলিকলি বলা শোভন হয়েছে বোর্ড সভাপতির? মাশরাফির যে ইমেজ দেশজুড়ে, তার কি এর কানাকড়ি আছে? কেনো নেই? মুশফিক বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরেক রত্ম। দীর্ঘদিন ধরে দেশকে শুধু দিয়েই যাচ্ছেন এই নিঃসঙ্গ শেরপা। তাঁর কাছে থেকে একে একে সব অধিনায়কত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে। তবু নীরবে খেলেই যাচ্ছেন মুশফিক। মাঠে-অনুশীলনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিয়ম মেনে চলা খেলোয়াড় আমাদের ভালোবাসার মুশি। পাপন সাহেব তাঁকে মর্যাদা দিতে না পারাটা এটি তার অযোগ্যতা। মুশফিকের না। করোনা ভাইরাস আতঙ্কে বাংলাদেশ দলের এখন আর পাকিস্তান যাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশবাসীর ভালোবাসার মুশিকে অপমান করে নিজের জুয়াড়ি ভিলেন চেহারাটারই উন্মোচন করলেন নাজমুল হাসান পাপন।

ফজলুল বারী
fazlulbari2014@gmail.com

Facebook Comments

You may also like

সিডনির রকডেলে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশী ছাত্র নিহত

বিজয় পাল নামে ২৭ বাংলাদেশী এক ছাত্র আজ