দেশি কথন –  প্রথম পর্ব

দেশি কথন –  প্রথম পর্ব

0

মোহাম্মাদ রাফিউল হক :বিদেশী পণ্যের ভিড়ে আমাদের দেশীয় পণ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু আমাদের একটু স্বদিচ্ছাই পারে তাদের পুনর্জাগরণ ঘটাতে। তাই এখন থেকে আমি চেষ্টা করবো আমাদের দেশি পণ্য নিয়ে যারা দেশে এগিয়ে চলেছেন, তাদের কথা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরতে।

আজকে আমি আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব, কাকলিস এটায়ার (Kakoly’s Attire) এর স্বত্ত্বাধিকারী কাকলি রাসেল তালুকদারের সাথে। যিনি দেশে জামদানি নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার থেকে আমরা জানবো , অরিজিনাল ঢাকাই জামদানী এবং ইন্ডিয়ান জামদানীর পার্থক্য কি। নিচের লেখাটি সম্পূর্ণ তার লেখা।
” নিজের দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য আমাদের নিজেদের জামদানী পড়া ছবি সোস্যাল মিডিয়াতে আপ করছি, কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা যে শাড়িটি পরে আমি ছবি দিচ্ছি আসলেইতা অরিজিনাল ঢাকাই নাকি ইন্ডিয়ান জামদানী। কারন জামদানী কিনতে গেলে সব ম্যাক্সিমাম সেলাররাই ইন্ডিয়ান জামদানী কে দেশী ঢাকাই জামদানী বলে চালিয়ে দেন। সেটা জেনে হোক, না জেনেই হোক। আজকে আমি লিখছি আমি কিভাবে দুইটা শাড়ির পার্থক্য করি,সে ব্যাপারে।

১. ইন্ডিয়ান জামদানী মেশিন মেইড,আর অরিজিনাল জামদানী হ্যান্ড মেইড।মেশিন মেইড একটা শাড়ির বুনন আগাগোড়া একই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অরিজিনাল ঢাকাই জামদানী তৈরি হয় হাতে।এর প্রতিটি সুতা একটা একটা করে বুনা হয় দুইজন ব্যাক্তির মাধ্যমে। তাই প্রতিটি শাড়ির তানা -বাইন সব আলাদা।
২. ইন্ডিয়ান জামদানীর সুতা হয় হাফসিল্ক, আরো স্পেসিফিকলি বল্লে নায়লন এর সুতা।যেটার তানা এবং বাইন একই সুতায় তৈরি। তানা থেকে যদি একটা সুতা নিয়ে পোড়ানো হয় সেটা গুটি বেধে যাবে।অন্য দিকে অরিজিনাল ঢাকাই জামদানী তৈরি হয় সুতি,হাফসিল্ক এবং রেশম সুতায়।একই ডিজাইন এবং কালারে এমন তিন কোয়ালিটির শাড়ি হতে পারে।কিন্তু তানার সুতা পুড়ালে গুটি বাধবেনা ছাই হয়ে যাবে।

কাকলি রাসেল তালুকদার ও লেখক 

৩. ইন্ডিয়ান জামদানীর কালারগুলো খুব চকচকা হয়।একুরেট কালার পাওয়া যায় বলে কাস্টমাররা ওই শাড়ির প্রতি আকৃষ্ট হয় বেশি।কিন্তু চকচক করলেই তো আর সোনা হয়না ! দেশী জামদানীর কালারগুলো চোখে আরাম লাগে।দেখতে সোবার মনে হয়।উজ্জ্বল কালারগুলোতেও একটা নরম আভিজাত্য আছে।

৪. ইন্ডিয়ান জামদানীর পাড় একবার পরলেই বটে যায়।পিছনের দিকে উচু হয়ে জেগে থাকে যা যেটা অরিজিনাল ঢাকাই জামদানীতে হয়না।

৩. ইন্ডিয়ান জামদানী গায়ে কাটা বাদে কারন শাড়ির পিছনে সুতা উঠানো থাকে,ফুলে ফুলে থাকে, মানে আনকম্ফোর্টেবল কিন্তু ঢাকাই জামদানী কটন বেজ/ রেশম এর হয় বলে অনেক আরামদায়ক হয়।

৪. ইন্ডিয়ান জামদানী মেশিন মেইড বলে ২-২.৩০ ঘন্টায় একটা শাড়ি তৈরি হয়ে যায়,যেখানে অরিজিনাল ঢাকাই জামদানী তৈরি করতে একজন তাঁতী কারিগর এবং তার সাকরেত মিলে মিনিমাম ৭দিন থেকে ৬মাস/১ বছর + সময় লাগে ডিপেন্ড করে সুতা, কাজের ধরন এবং কারিগর এর দক্ষতার উপর।

৫. ইন্ডিয়ান জামদানী তে কাজ বেশি কিন্তু প্রাইস কম হয়।যেহেতু মেশিন মেইড তাই টাইম কম,পরিশ্রম কম,খরচ কম,তাই দামও কম। ২ ঘন্টায় তৈরি একটা অভার অল শাড়িতে কাজ করা ইন্ডিয়ান জামদানীর প্রাইস ৩০০০-৪৫০০ হয়।যেখানে এই কাজের ঢাকাই জামদানী বুনতে ১- ১.৫ মাস সময় লাগে।প্রাইসও ১২-১৫ হাজার+ হয়।

৬. ইন্ডিয়ান জামদানীতে, পুরা শাড়িতে একই কাজ হয়ে থাকে ম্যাক্সিমাম। যেটার দাম ৩০০০ সেটাতে যেমন কাজ, যেটার ৪০০০ টাকা ওটাতেও সম পরিমান কাজ ! আসলে যার কাছে যেমন রাখতে পারে।অন্য দিকে ৪০০০ টাকার একটা অরিজিনাল ঢাকাই জামদানী শাড়ির বডিতে ভারি কাজ থাকলেও কুচিতে অথবা ঘুরির পাশে হাল্কা কাজ থাকে।

৭.সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আঁচল। আমরা যারা জামদানী কিনে অভ্যস্ত না / কম জানি তাদের জন্য জামদানী চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো আঁচল  দেখা। এখনকার ম্যাক্সিমাম ইন্ডিয়ান জামদানী শাড়িগুলোতে আঁচল একই ধাচের।লম্বা লম্বা ডাল ফুলওয়ালা। কারন একটা মেশিনের ডিজাইনের ধরন একই রকম।তাই শাড়িগুলোর আঁচলও একই রকম থাকে। মেশিন তো আর নিজের কাজের ভিন্নতা আনতে পারেনা যেটা তাঁতীরা আনতে পারে।অরিজিনাল জামদানীর আঁচলে ভিন্নতা আছে।কিন্তু মেশিনের ডাইস চেঞ্জ করে আঁচলে ডিজাইনও আসছে কিছু কিছু তবে তা সংখায় কম।ভ্যারাইটি নেই বল্লেই চলে।কারণ এগুলোতে কস্টিং বেশি পরবে বলে একটা ফ্যাক্টিরিতে ২-৩ টার বেশি ক্যাটাগরি থাকে না।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশের বিক্রেতা যখন বুঝতে পারে যে ক্রেতা ইন্ডিয়ান জামদানী / অরিজিনাল জামদানীর পার্থক্য বুঝেনা, তখন তারা ইন্ডিয়ান জামদানী অরিজিনাল বলে একেকটা শাড়ি ১০-১২ হাজার টাকায় সেল করে।আর ক্রেতা মনে একটা ধারণা নিয়ে যায় যে জামদানী এক্সক্লুসিভ শাড়ী। তাই কাজ বেশি তো প্রাইস বেশি।সেজন্য যখন বিক্রেতা একটা ইন্ডিয়ান জামদানী শাড়ী দেখায় তখন সে আসল/ নকল না বুঝে চাকচিক্যের মোহে পড়ে নকল শাড়ি আসল শাড়ির দামে কিনে নিয়ে আসে।

পরিশেষে বলবো, এখনই সময় সচেতন হওয়ার,সৎ হওয়ার।আপনার, আমার একটু সচেতনতা দেশী পণ্যের প্রচার এবং প্রসারে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।
ভালো থাকুন।
ধন্যবাদ। ”

 

 

 

 

 

 

Facebook Comments

You may also like

তখন সিনেমাঃ এক রত্মার নায়িকা শাবানা হয়ে ওঠার গল্প

ফজলুল বারী:চট্টগ্রামের রাউজানের ডাবুয়া গ্রামের একজন শ্রমজীবী টাইপিস্ট