দিল্লীর তবলিগ জামাতের মুসলমানরা এখন ভারতের মানুষের করোনা ভীতির কাঠগড়ায়

দিল্লীর তবলিগ জামাতের মুসলমানরা এখন ভারতের মানুষের করোনা ভীতির কাঠগড়ায়

0

ফজলুল বারী :করোনার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিত একটি শব্দের নাম লকডাউন। এরমাধ্যমে মানুষের চলাচল যারা সীমিত করে দিতে পেরেছে তারা করোনা যুদ্ধে পেয়েছে তত সাফল্য। লকডাউন কড়াকড়িভাবে মানা হয়েছে চীনের উহানে। এরজন্যে উহানের বাসিন্দা কোন চীনা নাগরিকের মাধ্যমে রোগটি ভিন্ন কোন দেশে ছড়ায়নি। পরিপূর্ন লকডাউনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে পারায় আবারও প্রমান হয়েছে চীন যা পারে বিশ্বে আর কেউ তা এভাবে পারেনা। অনেকে বলতে পারেন চীনে গণতন্ত্র নেই। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা নেই। তাই চীন তা পেরেছে। কিন্তু যে গণতন্ত্র মহামারী নিয়ন্ত্রন করতে পারেনা, থামাতে পারেনা মৃত্যুর মিছিল, সে গণতন্ত্রের সারবত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সো কল্ড গনতান্ত্রিক, ধার্মিকদের দেশেই এই রোগটি মহামারীর রূপ নিয়েছে অথবা নিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া এখনও প্রশাসনিক কাজকর্মে অফিসিয়েলি লকডাউন শব্দটি ব্যবহার করেনি। কিন্তু নানান প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই দেশে এরমাঝে মানুষের চলাচলও সীমিত করে ফেলা হয়েছে। এখানকার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও চলছে অনলাইনে। রেষ্টুরেন্ট-বার-ক্লাব, খেলার আসর সবকিছুই বন্ধ। এসব কড়াকড়িভাবে নিশ্চিত করায় প্রশান্তপাড়ের দেশটি বলছে তারা সামাজিক দূরত্বের সুফল পাচ্ছে। এতে করে কমে আসছে সংক্রমনের হার। উল্লেখ্য অস্ট্রেলিয়ায় এরমাঝে সবচেয়ে বেশি মানুষের করোনা টেস্ট হয়েছে। আড়াই কোটি মানুষের দেশে আড়াই লক্ষের বেশি মানুষের করোনা টেস্ট হয়েছে। যার ৯৮% ফল এসেছে নেগেটিভ।
সামাজিক দূরত্ব কড়াকড়িভাবে মানাতে এদেশে বেড়েছে পুলিশি টহল। আইন লংঘন পেলেই জরিমানা করছে পুলিশ। শুক্রবার সিডনির মাস্কাট এলাকার এক পাড়ার মাঠে টহলে গিয়ে পুলিশ পায় কয়েকজন সেখানে ক্রিকেট প্র্যাকটিসে ছিলেন। তাদের প্রত্যেককে ১৬৫২ ডলার করে জরিমানা করা হয়েছে। জনসমাবেশ এড়াতে এদেশের সরকার পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেয়। মুখে মসজিদ বন্ধ করতে বলেনি। কিন্তু ইনডোরে একশর কম জনসমাবেশ আর সামাজিক দূ্রত্বের কথা বলে দিতেই মসজিদগুলো বন্ধ হয়ে যায়। মসজিদ-গির্জা সহ সব ধর্মীয় উপাসনালয় বন্ধ হয়ে গেছে। সৌদি আরব কাবার ঘর বন্ধ করেছে।
কিন্তু বাংলাদেশের মতো সরকারগুলো মসজিদ বন্ধের কথা উচ্চারনের সাহস করেনি! আর যে সব দেশে মসজিদ বন্ধ করা হয়েছে সে সব দেশের মুসলমান অমুসলিম হয়ে যায়নি। করোনা দুর্যোগের এই সময় স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক নিয়ে একটি ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের কুফল ভোগ করছে ইতালি। এটিও দেশটির জন্যে করুন এক অভিজ্ঞতা। মূলত ওই ফুটবল ম্যাচের পরই করোনা ভাইরাস ইতালিতে মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ইতালি আজ মৃত্যুপুরী। কবে এই মৃত্যু মিছিল থামবে তা কেউ জানেনা। স্পেনেরও একই অবস্থা। সারা পৃথিবীর পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্য নিউইয়র্ক! স্ট্যাচু অব লিবার্টির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার আপডেট না করলে কি আর হয়! মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখনও করোনা মেইড ইন চায়না’ বলে বলে টিপ্পনি কাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
আর ততোক্ষনে সেই নিউইয়র্কে করোনা ভাইরাসের জীবানু বহন করে ঘাতক পর্যটকরা পৌঁছে গেছেন! এভাবে ইতালির পর নিউইয়র্ক হয়ে গেছে করোনা ভাইরাসের নয়া এপিক সেন্টার। আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে নিউইয়র্কে উবার-টেক্সি চালান। সরল তারা বুঝতে পারেননি গাড়িতে গাড়িতে পর্যটক যাদের নিয়ে ঘুরছেন তারা নীরব ঘাতক। করোনা ভাইরাসের জীবানু বহন করে বেড়াচ্ছেন সেই সব ঘাতক পর্যটক। করোনা মহামারীতে তারা মরছেন, সোনার দেশের রেমিটেন্স যোদ্ধা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এখন এই মহামারীতে অসহায় মরছেন। নিউইয়র্কের বাংলাদেশিদের এক টিভি চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানে শুনছিলাম মসজিদ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে পরষ্পরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে টেক্সট বিনিময় করে নামাজের বিকল্প জায়গা খুঁজে নিয়েছিলেন। তাদের অনেকে এরমাঝে করোনায় আক্রান্ত।
এতোদিন বলা হচ্ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের আবহাওয়া করোনা জীবানুকে মহামারীর পর্যায়ে নেবার অনুকূল নয়। এমন ধারনাকে যেন ব্যাঙ্গোক্তি করলো ভারতের প্রভাবশালী তবলিগ জামাত! এক সময় ঝামেলা মুক্ত মুসল্লিদের সমাবেশ হিসাবে তবলিগ জামাতের সুনাম ছিল। এখন এই জামাতের লোকজন এখন ঢাকায়-টঙ্গীতে মারামারিও করেন। এই মারামারিটা অন্য জায়গায় চলে গেছে। কয়েকদিন আগে ইনবক্সে একজন একটা লিঙ্ক দিলো। সেটিতে বাংলাদেশের এক মসজিদের সামনে কিছু মুসল্লি লিফলেট করছিলেন।
সেই লিফলেটে লেখা হয়েছে করোনা মুসলমানদের জন্যে ক্ষতিকর কিছু নয়। করোনাকে কেউ আমল-পাত্তা দিয়ে ঈমান দূর্বল করবেননা। এটি কাফেরদের জন্যে খোদার গজব! লিফলেটটি পড়ে ভয় পেয়ে যাই। এটা কী আজকের যুগের দেশের ডিজিটাল বাংলাদেশের চেহারা! এমন এনালগ লোকজন নিয়ে একটি দেশ ডিজিটাল হয় কী করে? এসব কী দেখার কেউ নেই? বাংলাদেশে না কথায় কথায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়! এই সময়ে এটি কী কোন নিরাপদ লিফলেট? এদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কী?
গত বেশ কয়েক মাস ধরে ভারতের কাশ্মীরে মুসলমান নিগ্রহ নিয়ে দেশটি বেকায়দায় ছিল। এরপর ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে আরও বেকায়দায় পড়ে দেশটির বিজেপি সরকার। এই দুটি ইস্যুতে ভারতের মুসলমানদের পক্ষে দেশটির শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। দিল্লীর তবলিগ জামাতের মসজিদ ভিত্তিক করোনা সংক্রমনকে কেন্দ্র করে ভারতের মুসলমানদের পক্ষে দাঁড়ানো লোকজনই এখন বেশি বিব্রত। এই যুগে এই সময়ে এসে এভাবে কোন সুস্থ মানুষ কী মসজিদের ভিতর সমাবেশ করে এমন একটি মহামারী রোগ ছড়ায়? এখন দিল্লীর এক মসজিদের ঘটনায় ভারতে করোনা রোগীর সংখ্যা এক লাফে দ্বিগুনের বেশি হয়ে যাওয়ায় অনেকে দুষছেন ভারত সরকার আর দিল্লী সরকারকে। কেনো তারা মসজিদে এতো মানুষের সমাবেশ করতে দিলো! আর এ ঘটনায় এখন ভারতের তবলিগ জামাতের মুসলমানরা ভীতসন্ত্রস্ত মানুষজনের ক্ষোভের কাঠগড়ায়!
যেখানে করোনা সংক্রমন ঠেকাতে কার্ফু দিয়ে মক্কা-মদিনায় মসজিদ বন্ধ করা হয়েছে, সেখানে ভারতেও বিষয়টি এমনই স্পর্শকাতর যে এখানে এই সময়ে মসজিদ খোলা কেনো এমন প্রশ্নও কেউ করতে সাহস পাচ্ছেনা! আগেতো মানুষকে বাঁচাতে হবে। মানুষ বাঁচলেতো আবার সে আবার মসজিদে যাবে, তখন মসজিদগুলোও বেঁচে থাকবে। মরে যাওয়া মসজিদের পরিত্যক্ত অনেক মসজিদ-মন্দিরের পরিত্যক্ত রূপওতো আমরা দেখি। এখন করোনা সংক্রমনের কারনে তবলিগ জামাতের মুসল্লিদের যে সারা ভারত থেকে ধরে ধরে এক জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে, বিদেশি মুসল্লিদের ভিসার প্রশ্নে ভারত কালো তালিকাভূক্ত করেছে, এতে কী ভারতের মুসলমানদের সম্মান বেড়েছে?
দিল্লীর ঘটনা করোনা ভাইরাস সংক্রমনে বাংলাদেশের ঝুঁকিও বেড়েছে। ভারত থেকে তবলিগের লোকজন যারা বাংলাদেশে এসেছেন তাদের কাকরাইল ও যাত্রাবাড়ির দুটি মসজিদে কোয়ারিন্টানে রাখা হয়েছে। করোনা ঝুঁকির মানুষজনকে মসজিদে কোয়ারিন্টানে রাখার পদ্ধতিটা পছন্দ হলোনা। পুলিশের লোকজন বলছে তারা মসজিদের ভিতর থাকবেন, সেখানে তাদের খাওয়াদাওয়ারও সমস্যা নেই। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ন যে মানুষজনের এখন সর্বক্ষনিক চিকিৎসকদের মনিটরিং’এ থাকার কথা, মসজিদের ভেতরে তারা কী আরও বেশি রোগাক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে পড়ে গেলেননা? কারন তবলিগের লোকজনতো এক প্লেটে একসঙ্গে অনেকে বসে খাওয়াদাওয়া করেন! গোল হয়ে একসঙ্গে এক প্লেটে কী সামাজিক দূরত্ব মেনে খাওয়াদাওয়া সম্ভব? প্লিজ, বিষয়টি আরেকবার ভাবুন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি এভাবে বাড়িয়ে দেবেননা।

Facebook Comments

You may also like

ফিরে আসুন প্রিয় নাসিম ভাই। বাংলাদেশ বিরোধী রাজাকারদের মোকাবেলায় আপনাকে দরকার।

ফজলুল বারী: এখনও সংকটাপন্ন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ