ভ্যাকসিন দেয়ার পরেও কেন করোনা আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ ?

ভ্যাকসিন দেয়ার পরেও কেন করোনা আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ ?

0

আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস ছিল ৪ জুলাই , আর ততদিনে আমেরিকায় ৬০% মানুষ ভ্যাকসিন দিয়ে ফেলেছিল। মাস্ক পরার উপর নিষেধাজ্ঞাও তুলে নিয়েছিল আমেরিকার বেশিরভাগ রাজ্য। শীত, বসন্ত লম্বা সময় ধরে লকডাউনা বন্দিদশা থেকে বের হয়ে এসে গ্রীষ্মকালটা আনন্দে কাটার জন্য ম্যাসাচুসেট্সের ক্যাপ কড বিচে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ আনন্দ করার জন্য। কিন্তু কোরোনার ডেল্টা ভেরিয়েন্ট সেখানে হানা দেয় এবং কয়েকদিনের মধ্যে শত শত লোককে আক্রান্ত করে ফেললো। আক্রান্তদের চারভাগের তিনভাগই সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দেয়া ছিল।

ক্যাপ কড ক্লাস্টার এর ৪৬৯ ডেল্টা ভেরিয়েন্টে আক্রান্তদের মধ্যে কেউ মারা যায়নি , শুধুমাত্র ৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো , দুইটি ভ্যাকসিন দেয়া মানুষের দেহে যে পরিমান ডেল্টা ভেরিয়েন্ট ভাইরাস ছিল , ঠিক একই পরিমানের ভাইরাস পাওয়া যায় কোনও ভ্যাকসিন না দেয়া মানুষের দেহেও। তাই আমেরিকার সেন্টার্স ফর ডিসিসি কন্ট্রোল প্রিভেনশন (CDC), ঠিক তার পরপরই ঘোষণা দেয় ভ্যাকসিন দেয়া থাক আর না থাক আমেরিকাতে সকলকেই মাস্ক পরতে হবে।

তাহলে ভ্যাকসিন দিয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার কি হলো সেটাও প্রশ্নের মুখে ? ভ্যাকসিনের আসল কাজটা কি ?
কিন্তু ভ্যাকসিন দেয়ার পরেও ইনফ্লুয়েঞ্জা , হাম (জলবসন্ত) ও আরও অনেক রোগে ভ্যাকসিন দেয়া মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ইনফেকশন ডিজিজ কন্ট্রোল বিষয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর পল গ্রিফিন বলেন ,”আমেরিকা ও ইজরাইলের সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দেয়ার পরও ডেল্টা ভেরিয়েন্ট ব্যাপকভাবে আঘাত হানলেও , আক্রান্তদের ১০০% প্রতিরোধ না করলেও, শারীরিকভাবে ব্যাপক ক্ষতি করতে পারেনি। গাড়ির সিট বেল্ট পরা যাত্রীদের গাড়ি দুর্ঘটনার বাঁচানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করে তুলনামূলকভাবে যে যাত্রী সিট্ বেল্ট না পরে কিন্তু তারপরেও শুধু সিট্ বেল্ট পরলেই দুর্ঘটনায় ১০০% জীবন বাঁচানোর নিরাপত্তা পাওয়া যায় না। কিছু মানুষ সবসময় ঠিক কাজটিই করে কিন্তু ভাগ্য মাঝে মাঝে সুপ্রসন্ন হয় না । ”

কিছুদিন আগে আমেরিকার এক গবেষণায় বের হয়ে এসেছে , ভ্যাকসিন দেয়া মানুষের সাথে তুলনা করলে একজন ভ্যাকসিন না দেয়া মানুষের অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে যাবার সম্ভাবনা থাকে ২৯ গুন্ বেশি । অস্ট্রেলিয়াতেও ঠিক একই ধরণের ডাটা দেখা যাচ্ছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এর ক্ষেত্রে।

ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির NHMRC Clinical Trials Centre এর বায়োস্ট্যাটিসটিক্স এর অধ্যাপক ইয়ান মার্সছনার বলেন ,”ভ্যাকসিন দেয়া মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে মানে এই না যে ভ্যাকসিন কাজ করছে না। ভ্যাকসিন এমনভাবে মানব দেহের কোষগুলোতে এন্টিবডি তৈরী করে বসে থাকে,যখনই একই ধরণের ভাইরাস এসে কোষগুলোকে মারার চেস্টা করে তখনি ঐ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে যায় এবং ভাইরাসের কার্যক্ষমতা নামিয়ে দেয়। কিন্তু ভ্যাকসিন কোনোদিন মানুষের শরীরে প্রবেশের দরজা বন্ধ করতে পারে না। ভ্যাকসিন দেয়া অনেকেই বুঝতেও পারেনা যে সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ,কারণ করোনা আক্রান্তের কোন লক্ষনই দেখা যায় না এবং কয়েকদিন পরে সে ভাইরাস মুক্ত হয়ে যায় এমনিতেই , শুধু টেস্টেই ধরা পরে যে ভ্যাকসিন দেয়া মানুষও করোনা আক্রান্ত হয়েছে।”

গত ৩০ জুলাই আমেরিকার এক গবেষনায় দেখা গিয়েছে , ১% সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দেয়া মানুষকে করোনা আক্রান্ত করেছে। আমেরিকার CDC র তথ্য অনুযায়ী চারভাগের তিনভাগ সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দেয়া মানুষ যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল কিংবা মারা গিয়েছিল তাদের সবারই বয়স ৬৫ এর উপরে। CDC র আরেক গবেষণায় দেখা যায়, যাদের শরীরের অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ( কিডনি অথবা অন্য কোন অঙ্গ ) তাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দেয়ার পরেও ৪৪% মানুষের শরীরে করোনা রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা জন্মায়নি , একই রকম গবেষণা দেখা গিয়েছিল ইসরাইলেও যেখানে ৪৬% মানুষের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা জন্মায়নি। সেই জন্য ইসরায়েল , ফ্রান্স তিন নম্বর বোস্টার ডোজ দেয়ার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে ইতিমধ্যে।

গত ৩০ আগস্ট আমেরিকাতে ১৭৩ মিলিয়ন মানুষ সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দেয়া হয়ে গিয়েছে এবং CDCর তথ্য অনুযায়ী ১২,৯০৮ জন সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দেয়ার পরেও করোনা আক্রান্ত হয়ে হয় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে অথবা মারা গিয়েছে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে ইসরাইলের সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দেয়া ১১,০০০ স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে কিছু সন্দেহজনক কোভিড -১৯ এর লক্ষণ দেখা যাবার পরে তাদের টেস্ট করার পরে মাত্র ৩৯ জনের করোনা পজিটিভ পাওয়া গিয়েছে।

এদিকে আরেক গবেষণা বেরিয়ে এসেছে ,১২ বছরের উপরে ৮০% এর উপরে মানুষ ইসরাইলে সম্পূর্ণ টিকা দিয়ে ফেলার পরে সরকার কোরোনার নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে দিলে খুবই দ্রুত করোনা বিস্তার শুরু করেছে ৬০% মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে যারা সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন দিয়ে ফেলেছে। এই তথ্যের পরে , ভ্যাকসিন বিরোধীরা যেনো নতুন এক বিশাল প্রমান হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছে এই যুক্তি নিয়ে যে ভ্যাকসিন আসলে কোন কাজ করে না। কিন্তু এই গবেষণার ঠিক বিপক্ষে যুক্তি দেন ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়ার বায়োস্ট্যাটিসটিক্স জেফরি মরিস বলেন , এই নম্বর সম্পূর্ণ উল্টা, ভ্যাকসিন না দেয়া মানুষদের হাসপাতালে ভর্তি হবার প্রবণতা ৩.৫ গুন্ বেশী ভ্যাকসিন না দেয়া মানুষদের ক্ষেত্রে।

অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল স্বাস্থ্য বিভাগের এক প্রতিনিধি জানান , ” রাজ্য ও টেরিটরীতে ভ্যাকসিন দেয়া মানুষদের করোনা আক্রান্তের তথ্য সংগ্রহ করছে , এছাড়াও ফেডারেল সরকারের বিশেষজ্ঞ কমিটিই ATAGI বিদেশের তথ্য নিয়েও গবেষণা করছে , যদি বুস্টার ভ্যাকসিন দেয়ার প্রয়োজন হয়। ”
তথ্যসূত্রঃ সিডনি মর্নিং হেরাল্ড

Facebook Comments

You may also like

সিডনিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

সিডনিতে ৭ নভেম্বর রবিবার সাংবাদিকদের সংগঠন অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ