শ্রীলংকার আগুন এখানে জ্বলবে কেমন করে

শ্রীলংকার আগুন এখানে জ্বলবে কেমন করে

ফজলুল বারী:  শ্রীলংকা জ্বলছে। দ্বীপ দেশটির চলমান ঘটনার খবর লেখা ও প্রকাশে আমাদের কিছু পত্রিকার ভূমিকা দেখিপড়ি আর হাসি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকে ভীষন তৎপর। মনে বড় আশা তাদের একটাই, বাংলাদেশেও এমন কিছু ঘটতো যদি।

বাংলাদেশেও এমন কিছু হবার পরিবেশ আছে। সুযোগ নেই। কারন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। ইনি এই মূহুর্তের পৃথিবীর একমাত্র সর্বক্ষণিক প্রধানমন্ত্রী। যিনি নামাজ আর ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া সারাক্ষণই ফোন হাতে শাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সক্রিয়। তাঁর কোন সাপ্তাহিক ছুটি বা অবকাশ নেই!

তাঁর নেতৃত্বের বড় একটি গুণ হলো, কোন জেদাজেদি নেই। আড়িয়াল বিলে তিনি তাই বিমান বন্দর করেননি। জেদাজেদি করেননি কোটা আন্দোলন নিয়ে। তবে তিনি কৌশলী। কারন তিনিও একজন রাজনীতিবিদ। রাজনীতিবিদদের কৌশলী হতে হয়।

রাজনৈতিক দল কোন রামকৃষ্ণ মিশন অথবা আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মতো সেবা সংস্থা নয়। আওয়ামী লীগও একটি রাজনৈতিক দল। দলের সর্বশেষ নীতি নির্ধারনী বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী নির্বাচন কঠিন হবে। সব প্রার্থীকে পাশ করে আসতে হবে যার যার যোগ্যতায়।

গত নির্বাচনের আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসের কর্মকর্তাকর্মচারীদের কাছ থেকে ফেয়ারওয়েল নিচ্ছিলেন। ‘জনগণ যদি আবার ভোট দেয় তাহলে আবার আসিবো ফিরে, নয়তো নয়’। এবারের বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনা যেনো আরেকটি সত্য পরোক্ষভাবে বলে দিয়েছেন।

তাহলো, এই যে গত দুটি নির্বাচনে তাঁর কারনে অনেক কলা গাছ প্রার্থীও পাশ করে এসেছেন। দলকে তিনি এখানে বারবার ক্ষমতায় আনছেন। ক্ষমতায় ধরে রাখছেন। আর সুযোগ পেয়ে বেহুশ অনেকে ক্ষুন্ন করছেন তাঁর ও দলের ভাবমূর্তি। আওয়ামী লীগের অনেক এমপিমন্ত্রীদের মান নিয়েও এখন প্রশ্ন আছে।

আসলে বাংলাদেশের রাজনীতি সহ নানাকিছুর যা চেহারা এখন এমন, এখানে রাজনীতি সচেতন সৎ ও যোগ্য প্রার্থী তিনশোজন পাওয়া কঠিন। দেশের সৎ ও যোগ্য লোকজন নানা কারনে প্রধান দলগুলোর রাজনীতি বিমুখ। অথবা এই দলগুলো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে যে এমন লোকগুলো যাতে তাদের কাছে না আসে।

সবার পছন্দ যেনো অনুগত কর্মচারী! সব সময় বলবে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে। আপনিই সেরা নেত্রী অথবা ম্যাডাম অথবা স্যার! মির্জা ফখরুল, খন্দকার মোশাররফদের চেহারা দেখেন? অথবা ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালামের।

অনুগত কর্মচারীর জীবনে এদেরকেও সারাক্ষণ টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে এখন তারেক সাহেব অথবা তারেক স্যার বলে বলে রাজনীতি করতে হয়! কারন তিনিই যে এখন মালিক। অথচ বয়সে মেধায় দক্ষতায় তারেক রহমান এদের নখের সমতূল্যও নন। তিনি ছাত্র কেমন ছিলেন তাও জানেন সবাই।

গিয়াস উদ্দিন আল মামুন কেনো তার বন্ধু, বনানীতে তারা কেনো এক সময় বাসা নিয়েছিলেন তা নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট আজও হয়নি। বিলাত প্রবাসী এক আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রীর নাম ছিল হাওয়া বেগম। তিনি বনানীতে একটি বাড়ি কিনে স্ত্রীর নামে বাড়ির নামকরন করেন হাওয়া ভবন।

কুমিল্লার মুরাদ নগরের বিএনপির নেতা কায়কোবাদ বাড়িটি প্রথম ভাড়া নিয়েছিলেন। পরে তা খালেদার রাজনৈতিক কার্যালয়ের নামে তারেকের হাওয়া ভবন হয়। বিএনপির ২০০১০৬ জমানায় তারেক রহমান কিভাবে এই হাওয়া ভবনের নামে দেশে দুর্নীতির প্যারালাল শাসন গড়ে তুলেছিলেন, বিএনপির নেতারা এর স্বাক্ষী।

সেই দায় নিয়ে ষোল বছরের বেশি সময় ধরে তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। আর যার দুর্নীতিস্বেচ্ছাচারের জন্যে সবার এই পরিণতি, তিনি সহিসালামতে আছেন বিলাতে। বিদেশে যারা থাকেন তারা জানেন জীবন কত কঠিন। প্রতি সপ্তাহের রাহা খরচ তুলতে কি রকম পেরেশানিতে থাকতে হয়।

আর এই নেতার কোনদিন কাজকর্ম করা লাগেনি। ষোল বছর ধরে গোটা পরিবারের রাহা খরচ জোগাচ্ছে ভূতে! তারেকের মেধা যোগ্যতার কথা দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষজনবিএনপির বুদ্ধিজীবীরাও ভালো জানেন। ঠোঁটকাটা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীতো প্রায় বলেই ফেলেন, জাইমাকে করুন আমাদের নতুন মালিক।

আওয়ামী লীগ সরকার দেশের জন্যে যুগান্তকারী অনেক কাজ করেছে এবং করছে। এর বাইরে আওয়ামী লীগ সরকার হিসাবে নানান ক্ষেত্রে ব্যর্থতারও পরিচয় দিচ্ছে। সাধারন সব ধারনাকে ছাড়িয়ে গেছে দুর্নীতি। ভোজ্য তেলের দাম সহ নিয়ন্ত্রনহীন বাজার পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন চলছে দূর্বিষহ অবস্থায়।

দলের দুর্নীতিবাজদের মতো বাজারকে ম্যানুপুলেট করা লোকদের দমনেও সরকার ব্যর্থ। নানান ম্যানুপুলেশনে দেশের মানুষ শুধুই ফতুর হচ্ছে। আর তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে তত্ত্বকথা বলা হচ্ছে মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে! আয়তো শ্রীলংকারও বেড়েছিল!

মানুষকে বারবার ফতুর করে আয় বাড়ানোর গল্প না বলে রাজাপক্ষেদের পরিণতি পড়ুন। বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের জন্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক রাজনৈতিক অবস্থানটি হলো প্রতিপক্ষের কোন গ্রহনযোগ্য নেতৃত্ব নেই। বিএনপির ম্যাডাম খালেদা জিয়া শারীরিকভাগে অক্ষম।

দেশের নেতা হবার মতো কোন গ্রহনযোগ্যতা নেই তারেক রহমানের। শেখ হাসিনাও পারিবারিক রাজনীতির উত্তরাধিকার। শেখ হাসিনার হাত ধরে চাচাফুফুখালার বাড়ির আত্মীয়স্বজন অনেকে এমপি হয়েছেন। কিন্তু এবার মন্ত্রিসভায় তাদের কাউকে রাখেননি। মেয়ের শশুরকেও বিদায় করে দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে দলের এবং বিরোধীদলের অন্য সবাই শিশু। গত নির্বাচনের আগে তিনি প্রতিপক্ষের লোকজনকে সংলাপে ডেকে এনে গল্পগুজব করেছেন। ব্যারিষ্টার মওদুদকে বলেছেন গুলশানের বাড়িটা আমাদের ফরিদপুরের মেয়ে হাসনা মওদুদের নামে লিখে দিলে থাকতো।

মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বলেছেন, আপনি লিখেন ভালো, আওয়ামী লীগের পজিটিভটাও লিখুন। ডক্টর কামাল হোসেনতো তাঁর মুরব্বি। কামাল চাচা। ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী এক সুযোগে প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে জমির তদবির করে ফেলেছেন! সবকিছু মিডিয়ায় রিপোর্ট করানো হয়েছে।

দেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পাপতাপ বর্তমান সরকার বিরোধীরা প্রত্যক্ষপরোক্ষভাবে বহন করে চলেছেন। এদের পুরোনোরা বয়সের ভারে ন্বুজ। রাজনীতির পথ পরিক্রমায় সামরিকবেসামরিক যখন যে যা দিয়েছে সেই হালুয়ারুটি খেয়েপরে চরিত্র হারিয়েছেন।

এখন তারা মূলত সোনালী অতীত সংঘের সদস্য। গল্প বলার দাদু। ছোটদলের বড় নেতা মাঝারি বয়সীদের কাজ হলো জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিতরে বা রিপোর্টার্স ইউনিটির ভিতরের সভায় দৈনিক অথবা সাপ্তাহিক বক্তৃতায় সরকারের সমালোচনা করা। মানুষের সামনে তাদের কোন বিকল্প প্রস্তাব নেই।

নেতা হিসাবে তাদের অনেকে বাগ্মীসুদর্শন হওয়াতে টেলিভিশনের টকশোতে তাদের কদর আছে। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ডে নির্বাচন করার মতো সাংগঠনিক শক্তিও তাদের অনেকের নেই। শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে শক্তিশালী বিরোধীদল না থাকার কথা বলেছেন।

অনেকে এরজন্যে দায়ী করছেন সরকারের দমননীতিকে! বলা হচ্ছে সরকার কাউকে দাঁড়াতেই দিচ্ছেনা! বাংলাদেশকে স্বাধীন করায় নেতৃত্ব দেয়া দলটিকেও দীর্ঘদিন নানাভাবে দাঁড়াতেই দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ বিরোধীদলে থাকতে যেভাবে টিকেছিল, বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলকে সেভাবেই টিকে থাকতে হয়।

বিএনপি প্রায় খোঁচা মেরে বলে আওয়ামী লীগ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর কাছে আবেদন করে রাজনীতি করার অনুমতি পেয়েছে! তারেক রহমান তার ভার্চুয়াল বক্তৃতাতেও এটি বলেন। এর মাধ্যমে যে বিএনপির গণতন্ত্রের মুখোশ খসে পড়ে তা তাদেরকে কেউ ধরিয়ে দেননা।

তারেক রহমানকে যা বলেননা তাহলো তার আব্বা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন সামরিক উর্দি পরে দেশে ঘরোয়া রাজনীতি শুরু করেছিলেন। জিয়ার সামরিক ফরমানে ঘোষনা করা হয়েছিল প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের কাছে আবেদন করে রাজনৈতিক দলের অনুমতি নিতে হবে।

বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর আব্দুল মালেক উকিল তখন দলের সিনিয়র নেতা। তিনি তার আবেদনে দলের আদর্শিক নেতা হিসাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা লিখেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরও মৃত বঙ্গবন্ধুকে জিয়ার ভীষন ভয় করছিল!

তখন শর্ত জুড়ে দেয়া হলো দলের ঘোষনাপত্রে মৃত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যাবেনা। মালেক উকিল তখন বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দিতে বাধ্য হন। এটাই ছিল জেনারেল জিয়ার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা! জিয়াও আর কোন দিন মৃত ব্যক্তি হননি আর বিএনপির কোন কাগজপত্রে জিয়ার নাম নেই!

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে আসার পর জিয়া শেখ হাসিনাকে তার পিত্রালয় ধানমন্ডির বত্রিশ নাম্বার সড়কে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দিয়েছেন। বাড়িতে ঢুকতে বাধা পেয়ে রাস্তায় বসে মিলাদ পড়েইতো শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু হয়। এরশাদ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রাজনৈতিক দল করেছিলেন ফ্রিডম পার্টি।

এরপর খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনি রশিদ, হুদাদের সংসদে নিয়ে এসেছিলেন। আর হাওয়া ভবনে বৈঠক করে শেখ হাসিনাকেইতো মেরে ফেলার ফন্দি করেছিলেন তারেক! এমন নানা ঘাতপ্রতিঘাত মোকাবেলা করেইতো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত। স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হঠাতে শ্রীলংকা স্টাইলের স্বপ্ন দেখে দেশে অতীতে হত্যাক্যুর সঙ্গে জড়িতদের বংশধররা! শ্রীলংকায় এখন যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের অতীততো হত্যাক্যুর কালিমা মাখা নয়। শেখ হাসিনা রাজাপক্ষেও নন।

এখন আবার দুষ্টু লোকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিয়াকে মারতে যাওয়ার ছবি বের করেছে। র‍্যাবের পোশাক পরা ছবি আছে তারেক রহমানের। ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদের পতন ঘোষনার পর জান বাঁচাতে পালিয়ে যাওয়া সাঙ্গপাঙ্গদের অনেকেই এখন বিএনপির নেতা অথবা জোটসঙ্গী।

পেট্রোল বোমা সন্ত্রাস, মতিঝিলে হেফাজত সন্ত্রাস, যুদ্ধাপরাধী সাঈদিকে চাঁদে দেখা যাবার কথা বলে অসময়ে আগুন জ্বালানোতো কম হলোনা। নরেন্দ্র মোদীকে ঠেকানোর নাম করে পুড়িয়ে দেয়া হয়ে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার রেলস্টেশন, ভূমি অফিস সহ নানাকিছু।

এখন অসময়ে তোমরা শ্রীলংকার মতো করে আগুন জ্বালাবে কেমন করে। আগুন জ্বালাতে পারে আওয়ামী লীগআওয়ামী লীগ নিজে নিজে! গত ইউপি নির্বাচনে সবাই সারাদেশ জুড়ে দেখেছে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ! তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। অতএব কান্ডারি হুশিয়ার!

You may also like

তেলের দাম বাড়ালে কি প্রতিক্রিয়া হয় দেখেছেন

ফজলুল বারী: পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে কি যে