বিদেশি অসুখটি দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন অসতর্ক প্রবাসীরা  

বিদেশি অসুখটি দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন অসতর্ক প্রবাসীরা  

0

ফজলুল বারী : কোভিড১৯ তথা করোনা ভাইরাস রোগটির বিপুল প্রচলিত বাংলাদেশি নাম ‘বিদেশি অসুখ’। দেশে ফোন করলেই বলা হয়, ‘বিদেশ তাকি বুলে এগু বিমার(অসুখ) আইছে, সবে আল্লা আল্লা করিয়ার’। চীনে এই রোগটার উৎপত্তি হলেও বাংলাদেশের সৌভাগ্য এই রোগটি কোন চীনা নাগরিকের মাধ্যমে বাংলাদেশে যায়নি। বাংলাদেশে এখন চীনা , জাপানী, কোরিয়ান প্রকৌশলীদের নেতৃত্বে বড় কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে। গুজবের দেশ বাংলাদেশে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগছে জাতীয় গুজব ছড়িয়ে মানুষ পিটিয়ে মারা হয়েছে  সেখানে যদি কোন চীনা নাগরিকদের মাধ্যমে রোগটি পৌঁছুতো তাহলে গুজব শিল্পীরা বিষয়টিকে কোথায় নিয়ে যেতো ভাবতে পারেন? আর দেশের  কিছু মিডিয়া সহ অনেকে এসব নিয়ে কাজ করতেতো মুখিয়েই থাকেন। 

জন্মসূত্রে চীনা ইউরোপীয় বৃদ্ধরা রোগটি বহন করেন ইউরোপে নিয়ে যান। এই বাহক বৃদ্ধরা বার-রেষ্টুরেন্টে খেতে গিয়ে রোগটি সেই দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেন। বাংলাদেশে যারা রোগটি দেশে নিয়ে এসেছেন তাদের অনেকে হয় ওইসব দেশের রেষ্টুরেন্ট মালিক অথবা কর্মচারী। অথবা তাদের ঘনিষ্ঠ। শুধু বাংলাদেশ নয়, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশে রোগটি একইভাবে পৌঁছেছে। রোগটির প্রাদুর্ভাব মহামারীর রূপ নিলে চীন এর এপিক সেন্টার উহান প্রদেশ লকডাউন করে দিলে চীনা নাগরিকদের মাধ্যমে রোগটি ছড়াতে পারেনি। আসলে রোগটি কিভাবে ছড়ায় এটি জানতে বুঝতে বুঝতেই সর্বনাশটি হয়ে যায়। প্রথম বলা হচ্ছিল চীনের একটি মাছ বাজার থেকে রোগটির উৎপত্তি! তখন অনেকে চীনারা কাঁচা মাছ খায়, আপনারা কাঁচা খাবেননা, ভালো করে সেদ্ধ করে খাবেন,  এমন ফতোয়া চলতে চলতেই একজন থেকে আরেকজনে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। আরবরা, ইরানিরা অভ্যর্থনা-সম্ভাষনের সময় হাবিবি বলে চুম্বনে অভ্যস্ত। তাদের চুম্বনে অথবা অভ্যর্থনার আলিঙ্গনে রোগটি পৌঁছেছে ইরান সহ আরব মুল্লুকে। জাপানে লকডাউন ক্রুজ থেকে উদ্ধারকৃত আক্রান্তদের মাধ্যমে রোগটি পৌঁছেছে আমেরিকা সহ আরও কয়েকটি দেশে। ওই টুরিস্ট জাহাজে থাকা একজন বয়োবৃদ্ধ ট্যুর অপারেটর অস্ট্রেলিয়ায় ফেরার পরেই মারা যান। 

 প্রথম দিকে বলা হয়েছে শুধু বুড়োরাই এই রোগে আক্রান্ত-মৃত্যুবরন করার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে সব বয়সী লোক থাকায় এই ধারনা পাল্টেছে। শনিবার সিডনির বিখ্যাত টুরিস্ট স্পট বন্দাই বীচ সহ সব জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মহামারী রোগটির সংক্রমন ঠেকাতে যে কোন সমাবেশে চার বর্গ মিটার দূরত্ব বজায় রাখার নতুন নীতিমালা ঘোষনা করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। এরপরই বন্দাই বীচ সহ সব জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকত বন্ধ করে দেয়া হয়। কারন সমুদ্র সৈকতে সময় কাটাতে যাওয়া তরুনরা অথবা পরিবারের সদস্যরা ঘনিষ্ঠভাবেই অবস্থান করেন। আর বাংলাদেশে দেখলাম লঞ্চের ডেকে বসেই ঈদের ছুটির মতো লোকজন বাড়ি যাচ্ছেন! বাংলাদেশে ট্রেনে-বাসে লোকজন যে বাস্তবতায় গাদাগাদি যাতায়াত করেন তাতে কোন বাহক তাদের সঙ্গে ভ্রমন করলে রোগটি ব্যাপক ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

বাংলাদেশের লোকজন বিদেশে কে কিভাবে গেছেন এর ওপরও তিনি বা তারা কতোটা আইনানুগ থাকেন তা নির্ভর করে। এদের অনেকে বিদেশে বাধ্য হয়ে আইনানুগ থাকলেও দেশে ফেরার পর এর উল্টো পথে হাঁটাচলা শুরু করেন। বাংলাদেশের সমাজে আবার আইন না মেনে চলতে পারাটা দাপট হিসাবেও দেখা হয়। এই দাপট কারোটা রাজনৈতিক, কারোটা প্রাতিষ্ঠানিক, প্রবাসীদেরটা অর্থনৈতিক। নতুবা যে প্রবাসী যেখান থেকে এসেছেন সেখানে আইনানুগ চললে দেশে ফিরে এর উল্টো চলবেন কেনো? চীনের উহান থেকে যখন বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে আটকা পড়া বাংলাদেশিদের আনা হয় তখন হজ ক্যাম্প তাদের জন্যে প্রস্তুত করা হয়েছিল। তখনও হজ ক্যাম্পের সুযোগ সুবিধা নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল সেই প্রবাসীদের। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও সেখানে সেই প্রবাসীরা কোয়ারিন্টান সময় পার করায় তাদের নিয়ে কোন বিপদ ঘটেনি। 

ইতালি ফেরত যে প্রবাসীদের নিয়ে সমস্যা হয় তাদের আগমন সংবাদ বাংলাদেশ সরকারের কাছে ছিলোনা। হঠাৎ করে এত বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর ইউরোপের এপিক সেন্টার থেকে ফেরার খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে তাদেরকে অপ্রস্তুত হজ ক্যাম্পে নেয়া হয়। এরপর তাদেরকে নিয়ে কি পরিস্থিতি হয়েছিল তা ওয়াকিফহালরা জানেন। সেনাবাহিনীর সদস্যদের ডেকেও যখন তাদের নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছিলোনা তখন তাদের পাঠানো হয় হোম কোয়ারিন্টানে। 

 কিন্তু তারা হোম কোয়ারিন্টানের নিয়ম মেনে চলেননি। এরমাধ্যমে ইতালি প্রবাসীদের মাধ্যমে ‘বিদেশি অসুখ’টি এসেছে বাংলাদেশে  অনেক এলাকায় ‘প্রবাসী’ শব্দটাই হয়ে গেছে ভীতির নাম! কারন এখন পর্যন্ত  প্রবাসীরা রোগটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন পরিবারে। এরমাঝে যে দু’জন মারা গেছেন তাদের মৃত্যু ডেকে এনেছেন তাদেরই প্রবাসী সন্তান-স্বজন। মাদারিপুরের শিবচর উপজেলাকে লকডাউন করা হয়েছে। লকডাউন বলতে যা বোঝায় সেটি পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি শিবচরে। কারন এদেশটায় যারা দিন আনে দিন খায় তাদের রুটি-রুজি বন্ধ করতে পারেনা রাষ্ট্র। সেটি করতে গেলে তাদের সবাইকে বাড়িতে খাবার সহ জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিতে হবে। বাংলাদেশ সেই সামর্থ্যবান কল্যান রাষ্ট্র নয়। 

 দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমান আদালত জরিমানা করছে কোয়ারিন্টান না মানা প্রবাসীদের। অনেকে বলছেন হোম কোয়ারিন্টানের সিস্টেমটাই ভালো নয়। সবাইকে সরকারি নিয়ন্ত্রনে কোয়ারিন্টান করানো উচিত ছিল। করোনা ভাইরাস সমস্যা শুরুর পর যে পরিমান প্রবাসী দেশে এসেছেন বা এখনও আসছেন, এতো বিপুল সংখ্যক প্রবাসীকে সরকারি উদ্যোগে কোয়ারিন্টানের ব্যবস্থা করাটা অবাস্তব। শুরুর দিকে সব দেশই কিছু কিছু কোয়ারিন্টানের ব্যবস্থা করেছে। অস্ট্রেলিয়া এমন প্রথম দলটিকে ক্রিসমাস আইল্যান্ডের মতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে নিয়ে গিয়েছিল। এখন সবাইকে  বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারিন্টানে পাঠানো হচ্ছে। 

বাংলাদেশে ডাক্তার-নার্সরা করোনা রোগীদের চিকিৎসায় তাদের নিরাপত্তার দাবি তুলেছেন। যৌক্তিক দাবি। সরকারকে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যেটা করছেন তা দেখেশুনে শিউরে উঠবেন উন্নত বিশ্বের সাংবাদিকরা। যেখানে সেখানে সম্ভাব্য করোনা ভাইরাস বাহকের ছবি নিতে কথা বলতে তাদের কাছে চলে যাচ্ছেন! সংবাদ সম্মেলন সহ যে যেখানে যাচ্ছেন কারও কোন মাস্ক বা প্রতিশেধক প্রস্তুতি বা সে দাবিও নেই! এক রিপোর্টার আমাকে লিখেছেন সারাদেশ লকডাউন দাবি করে লিখতে। বাংলাদেশে তা কত কঠিন তা যদি তিনি জানতেন! বাংলাদেশে যখন কোন কারনে কার্ফু দেয়া হয় তখন যত রিপোর্টার-ফটোগ্রাফার-ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী কার্ফু পাস নিয়ে রাস্তায় থাকে তখন আর কার্ফুরও ইজ্জত থাকেনা।  

রিকশাচালক-দিনমজুর সহ নিম্নআয়ের মানুষজনকে লকডাউন বলে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব না। গার্মেন্টস সহ সবকিছু বন্ধ করে দিতে হবে। পত্রিকা অফিস বন্ধ হলে দেশের ক্ষতি হবেনা, গার্মেন্টস বন্ধ হলে যেটা হবে। লকডাউনের চিন্তাটা হচ্ছে ওই রোগ নিয়ে যাতে আর কেউ বিদেশ থেকে আসতে না পারেন। সম্ভাব্য যারা কেরিয়ার-যারা আক্রান্ত-যারা আক্রান্তের সংস্পর্শে এসেছেন তাদের লকডাউন করে ঘিরে ফেলা। বাংলাদেশ সরকারের সামর্থ্য বিবেচনায় এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালোই চলছে। ব্যক্তিগত সতর্কতা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন। গুজব শিল্পীরা একটি অডিও লিঙ্ক পাঠাচ্ছেন! এতে একজন ডাক্তার বলছেন এরমাঝে অনেক লোক মারা গেছে কিন্তু সরকার তথ্য গোপন করছে! প্রিয় গুজব শিল্পী, কেউ মারা গেলে তার স্বজন-বন্ধু বান্ধব থাকে। আজকের দিনে এসব তথ্য গোপন সম্ভব নয়। অতএব এসব অডিও ক্লিপ আমাকে অন্তত পাঠিয়ে লাভ নেই। কাজেই এসবে পন্ডশ্রম না করে নিজেকে নিরাপদ করুন। সুযোগ পেলে করোনা কিন্তু গুজব শিল্পীকে ছেড়ে কথা বলবেনা।  

ফজলুল বারী
fazlulbari2014@gmail.com

Facebook Comments

You may also like

ডাক্তারদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের শাস্তি কী

ফজলুল বারী:আমি আমার বন্ধুদের মজা করে একটা কথা