জাতির পিতা যখন অন্ধকার সমাধি বাড়িতে একা

জাতির পিতা যখন অন্ধকার সমাধি বাড়িতে একা

0

ফজলুল বারী: প্রিয় প্রজন্ম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে বাড়িতে গিয়েছো কী কখনও তোমরা? যারা যাওনি তারা সময় করে যাবে। ভালো লাগবে। পবিত্র ভিন্ন এক অনুভূতিতে ভরে যাবে মন। আমার মতো ভিজতে পারে চোখও।
কারন সেখানেই বাবা-মা’র পাশে চিরঘুমে শায়িত ঘুমিয়ে আছেন আমাদের জাতির পিতা। তাঁর সমাধিই আমাদের জাতীয় তীর্থ। তাঁর কারনে আমাদের স্বাধীন এই বাংলাদেশ। আমাদের স্বাধীন মানচিত্র-পতাকা তাঁর দেয়া।
দেশে-বিদেশে আমরা যে আজ গর্বিত বাঙালি-বাংলাদেশি এসব তাঁর কারনেই। গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় থাকায় সে বাড়িটি এখন অনেক উজ্জ্বল সাজানো গোছানো। এখন আলো ঝলমলে উজ্জ্বল সেই সমাধি।
জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধান সহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ সেখানে যান। জাতীয় শোক দিবস সহ নানা উপলক্ষে সেখানে যান আওয়ামী লীগের সারা দেশের হাজার হাজার নেতা-কর্মী।
জাতীয় শোক দিবসে গাড়ির বহর নিয়ে সেখানে যেতেন চট্টলবীর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। জাতির পিতার সমাধিতে আয়োজন করতেন হাজার হাজার মানুষের মেজবান। তাঁর অনুসারীরা এখনও চট্টলবীরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিবৃন্দ সেখানে জাতির পিতাকে শ্রদ্ধা জানাতে যান। সেখানে যান বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী কূটনীতিক থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি সংস্থায় কর্মরত বিদেশিরাও সেখানে যান। সবাই এখন তাঁর মর্যাদা জানেন।
কিন্তু প্রিয় প্রজন্ম, ১৯৮৬ সালে আমি যখন প্রথম সে বাড়িতে যাই সেখানে পারতপক্ষে তেমন কেউ যেতেননা। নানাকারনে অনেকের সে মুখো হতে গা ছমছম ভয় করতো! আওয়ামী লীগও তখন ছন্নছাড়া দল একটি!

১৯৮৬ সালের জাতির পিতার কবর

কবে ক্ষমতায় আসবে আদৌ আসবে কীনা তখন কেউ তা নিশ্চিত জানতোনা। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর জীবিত দুই মেয়ে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা পিতার সমাধি জিয়ারত উপলক্ষে দাদা-দাদির বাড়িটায় গেলে সেখানে কিছু লোকের ভিড় হতো।
ধুলি জমা বাড়ির দরজা-জানালা মুছে পরিষ্কার করতেন কেয়ারটেকার বৈকুন্ঠ নাথ বিশ্বাস। আমিও সে বাড়িতে গিয়ে একমাত্র বৈকুন্ঠ দাদাকে সক্রিয় পেয়েছিলাম। প্রায় অন্ধকার একা একটি বাড়িতে তিনিই বাতি জ্বালাবার ব্যবস্থা করতেন।
দিনটি ছিল ১৯৮৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। পর্যটক আমি সেদিন গোপালগঞ্জ শহর থেকে পায়ে হেঁটে টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছিলাম। গ্রামের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেছে সরু এবড়ো থেবড়ো ভাঙ্গা রাস্তা। গ্রামের ছেলেপুলেরা রাস্তায় প্রায় লোকজনকে থামাচ্ছে।
একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদদের স্মরনে সম্মানে আমরা নগ্নপদে শহীদ মিনারের বেদিতে গিয়ে উঠি। কিন্তু এই ছেলেরা মেয়েরা বলছিল, না আজ শহীদ দিবস। আজ এ পথ দিয়ে হাঁটতে হবে নগ্নপদে। ভালো লাগে তাদের পবিত্র আহবান।
এরপর টুঙ্গিপাড়ার বাকি পথটা আমি নগ্নপদেই হেঁটেছি। কিন্তু ভাঙ্গা রাস্তার কারনে নগ্নপদে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে তখন এক বিস্ময় প্রশ্নেরও সৃষ্টি হয়। যার কারনে বাংলাদেশের সৃষ্টি তাঁর বাড়িতে সমাধিতে যাবার একটি ভালো পথও নেই!
অথচ এই বঙ্গবন্ধুর কারনে বাংলাদেশের অনেক মানুষের জীবনের একটি পথ তৈরি হয়েছে। ছোট অফিসার হয়েছেন সচিব। সেনাবাহিনীর মেজর হয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান। এরপর ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রপতি!
অথচ তাঁর বাড়িতে কবরে যাবার কোন ভালো একটি পথও নেই! তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ছিলেন। বাংলাদেশের একজন স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-জনপ্রতিনিধিও তার এলাকায়-বাড়িতে যাবার একটি ভালো পথ তৈরি করেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তা করেননি। কারন তিনিতো আমাদের জাতীয় নেতা। স্থানীয় বা এলাকার নেতা নন। তখন এ দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের। তৎকালীন নেতৃত্বের। তারা সে দায়িত্বটি পালন করেনি।
তখন দুপুর। গ্রামের বাড়িতে নির্জন দুপুরের রূপ সহজে অনুমেয়। বিশেষত যে বাড়িতে লোকজন থাকেননা। বাড়ির সামনে বাঁধানো পাশাপাশি তিনটি কবর। একটি কবরের সামনে গিয়ে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
চোখ ভিজে আসে। সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে এই একটি নামই শুনেছি বারবার। কবরে কারও রেখে যাওয়া শ্রদ্ধা-ভালোবাসার কিছু ফুল। খাঁটো চার দেয়ালের মাঝখানে মাটির নীচে শায়িত আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
টিনশেডের লম্বা একটি ঘর পেরিয়ে পুরনো দ্বিতল দালান। উঠোনের একপাশে রান্নাঘর। সবকিছু তালাবদ্ধ। উঠোন মাড়িয়ে পাশের বাড়ির প্রবেশ পথ। একতলা দালান বাড়ি। দেয়ালের রং কালো। এখানেও সুনসান নীরবতা।
দরজায় নক করে কিছু সময় অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। একজন পৌঢ় দরজা খোলেন। চুল-দাঁড়ি সব তাঁর ধবল সাদা। গায়ে জড়ানো ময়লা একখানা চাদর। তাঁর নাম বললেন শেখ মোহাম্মদ মুসা। তৎকালীন যুব মন্ত্রী শেখ শহীদের বাবা।
ভাবতে পারেন! তখন বঙ্গবন্ধুর স্বজন, বঙ্গবন্ধু পরিবারের একজন সুবিধাবাদী সদস্যও পারিবারিক ঐতিহ্যের দল ছেড়ে লোভে এরশাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে এরশাদের মন্ত্রী হয়েছেন! কিন্তু তবু তিনি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাবার একটা রাস্তাও বানাননি!
পরিচয় দিতেই বাড়ির ভিতরে আমন্ত্রন জানালেন শেখ শহীদের বাবা। কিন্তু প্রথমে দূঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন তোমাকে চা-টা খাওয়াতে পারবোনা বাপ। কারন বাড়িতে কোন লোকজন নেই। বাড়ির ভিতরের বারান্দায় বসে আলাপ শুরু হয়।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভায়েরা ভাইর। অর্থাৎ বেগম মুজিব এবং শেখ শহীদের মা দু’জনে আপন দুই বোন। সে হিসাবে শেখ হাসিনা শেখ রেহানার আপন খালাতো ভাই এই স্বৈরাচারী এরশাদের মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম।
পাশের ঘরের চাচাতো বোন বেগম ফজিলতুন্নেসাকে বিয়ে করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। শেখ মোহাম্মদ মুসা এই পরিবারের ঘর জামাই। তাঁর কাছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের পুরো দিনের বর্ননা জানতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন!
অক্ষমতা জানিয়ে বলেন, তিনি সেদিন বাড়ি ছিলেননা। তাই তিনি ঘটনা বলতে পারবেননা। তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতার ভায়রা ভাই। তাঁর ভায়রা ভাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
কিন্তু দুনিয়া জোড়া চাঞ্চল্যকর সেই ঘটনা তিনি বাড়িতে না থাকলেও শোনেননি জানেননি যদি কেউ বলেন তা কী বিশ্বাস করতে হবে? আমরাওতো ঘটনাস্থলে ছিলামনা। তাই বলে আমরাও কী বলতে পারি আমরা এসব জানিনা-বুঝিনা!
মীর মোশাররফ হোসেন যে ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাস লিখেছেন তিনি কী কারবালার ময়দানে ছিলেন? বাংলাদেশ ভ্রমনে বেরিয়ে আমার তথ্যের জন্যে প্রতিদিন নানান মানুষের মুখোমুখি হয়ে এমন নানান মানুষ আমি বুঝতে শিখেছি।
বঙ্গবন্ধুর এই ভায়রা ভাই, এরশাদের মন্ত্রী শেখ শহীদের বাবা শেখ মোহাম্মদ মুসাকেও তাই আমি বুঝতে পারি। এরপর তাঁকে বলি তাহলে সেদিনের ঘটনা কে ভালো বলতে পারবেন? তিনি নাম বলেন শেখ আশরাফুল হক আর বৈকুন্ঠ নাথ বিশ্বাসের।
তাদের খবর পাঠানো হলে তারা আসেন। তবে আগে আমার পরিচয়-উদ্দেশ্য দু’জনে নিশ্চিত হন। কিন্তু এ পর্যায়ে তাদের বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি শুরু করেন নিজের কথাবার্তা। শেখ মোহাম্মদ মুসার পেশা ছিল শিক্ষকতা।
আমাকে তিনি বলেন মুজিব আমার দোস্ত আছিল। দুই দোস্ত মিলে এক সময় আমরা এলাকায় আওয়ামী লীগের সংগঠন করেছি। গোপালগঞ্জের জলিরপাড়ে আমরা দুইজনে মিলে প্রথম করেছি আওয়ামী লীগের জনসভা।
ছেলের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেবার আত্মপক্ষের সাফাই গাইতে গিয়ে শেখ মুসা বলেন আওয়ামী লীগের লোকজনের কারনে শেখ শহীদ আওয়ামী লীগ করতে পারলোনা। আমার দোস্ত মুজিব আমার ছেলে শেখ শহীদকে খুব স্নেহ করতেন ভালোবাসতেন।
তাই মুজিব তাকে বাকশালের ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক করেছিলেন। আওয়ামী লীগের অনেক লোকজন এটাকে ভালো চোখে দেখেনি। মুজিবের মৃত্যুর পর দলের লোকজন শেখ শহীদকে এড়িয়ে চলতো। ব্যাপারটা তাঁর ভালো লাগতোনা।
শহীদ তখন বাধ্য হয়ে এরশাদের দলে চলে যায়। মুজিব পরিবারের এক সদস্যের এভাবে স্বৈরাচারী এরশাদের সঙ্গে হাত মিলানো নিয়ে তার পিতার আত্মপক্ষের বক্তব্যটি ৩৪ বছর আগের। শেখ শহীদ এখনও জাতীয় পার্টির ক্ষুদ্র একাংশের মহাসচিব।
তাঁর খালাতো বোন শেখ হাসিনা প্রায় এক  ধরে দেশের ক্ষমতায় আসীন। এরশাদের সঙ্গে জাতীয় পার্টিতে চলে যাওয়া মিজানুর রহমান চৌধুরী সহ অনেকে আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছেন। কিন্তু শেখ শহীদ কেন ফিরলেননা বা ফিরতে পারলেননা এর উত্তর শুধু তাঁর কাছেই আছে। (ক্রমশঃ)

Facebook Comments

You may also like

রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর ক্ষমতা মেশিন!

ফজলুল বারী: বাংলাদেশে আমাদের গৌরবের আহ্লাদের এক অবিরাম