আগামী ৯৬ ঘন্টা ঢাকার ভবিষ্যতের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ

আগামী ৯৬ ঘন্টা ঢাকার ভবিষ্যতের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ

ফজলুল বারী: টান টান উত্তেজনা। আগামী ৯৬ ঘন্টা ঢাকার ভবিষ্যতের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ন। ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র নির্বাচন হবে পহেলা ফেব্রুয়ারি। সঙ্গে কাউন্সিলর, সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীরাও আছেন। কিন্তু সবার দৃষ্টি মেয়র পদের দিকে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলই ঢাকার দুই সিটির মেয়র পদে কোটিপতি প্রার্থী দিয়েছে। এরমাঝে বিএনপির দুই প্রার্থী তুলনামূলক নবীন ও কমবয়স্ক, আওয়ামী লীগের প্রার্থী দু’জনই অভিজ্ঞ। আওয়ামী লীগ-বিএনপি এই নির্বাচনে জিততে মরিয়া। কারন এটি মুজিব জন্মশতবার্ষিকী। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় আসবেন আন্তর্জাতিক অনেক অতিথি। তাদের নাগরিক সম্বর্ধনায় ঢাকার মেয়রদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ন। বিএনপি মেয়র নির্বাচনে জিতে সরকার বিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে চায়। খালেদা জিয়ার মুক্তি ত্বরান্বিত করতে চায় ঢাকার মেয়র জিতে। কেউ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান!

নীলফামারীর সৈয়দপুরের সন্তান আতিকুল ইসলাম আতিক। বাংলাদেশের ওই বেল্ট থেকে এর আগে কোনদিন আর কেউ ঢাকার মেয়র হননি। গরিব এলাকা। ধনীরা কটাক্ষ করে বলেন ওই এলাকায় মফিজরা থাকেন। আটকেপড়া পাকিস্তানি বিহারীদের এলাকা। আতিক অবশ্য গরিব মানুষ নন। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের মালিক। সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগে আছেন অথবা ছিলেন আতিকের ভাইগন। তাবিথ আউয়াল বিএনপির ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে। বিদেশে পড়াশুনা করেছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে বড়লোক তাবিথ আউয়ালের নাম আছে বিদেশি দুর্নীতি তদন্তে। চুরি-দুর্নীতি ছাড়া বাংলাদেশের কেউ বড়লোক হয়না। প্রচারনার মাঝপথে এসে সিঙ্গাপুরের কোম্পানির তথ্য নির্বাচন কমিশনে জমা না দেবার অভিযোগ ওঠে তাবিথের বিরুদ্ধে। তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেননি। কিন্তু হাইকোর্ট তাবিথের পক্ষ নিয়েছে।

হাইকোর্টে তাবিথের পক্ষ নেন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ। ১/১১ এর আগে আওয়ামী লীগ তাকে ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর আসনে প্রার্থী করেছিল। এরও আগে তিনি আওয়ামী লীগ না বিএনপি কোথায় যোগ দেবেন তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। বিএনপি-জামায়াতের ঘনিষ্ঠ এক সম্পাদক এক রাতে তাকে খালেদা জিয়ার বাসায় নিয়ে যান। খবর পেয়ে শেখ হাসিনা তার আওয়ামী লীগে যোগদান অনুষ্ঠান করে ফেলেন।  কিন্তু শেখ হাসিনা গ্রেফতার হবার পর ব্যারিস্টার রোকন শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়াননি। এরজন্যে ১/১১’র পর আর আওয়ামী লীগের মনোনয়নও পাননি ব্যারিস্টার রোকন। এরপর থেকে আর তিনি আওয়ামী লীগের কোথাও নেই। কোর্টেও দাঁড়ান আওয়ামী লীগের বিপক্ষে।

ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, ইঞ্জিনীয়ার ইশরাক হোসেন ঢাকা দক্ষিনের দুই মেয়র প্রার্থীই বিদেশে পড়াশুনা করেছেন। ২০০৮ সাল থেকে ঢাকার ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর আসনের এমপি তাপস। গত দশবছরে আইন ব্যবসায় দেশের সবচেয়ে সফল ব্যক্তি তাকে বলা হয়। তাপসের জীবনের করুণ একটা দিক তিনি বলেননা, অনেকে জানেও না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট সেই ভয়াবহ হত্যাকান্ডের রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যার রাতে বাবা শেখ ফজলুল হক মনি, মা আরজু মনিকে তিনি হারান। সেই রাতে বেঁচে যান তারা পরশ-তাপস দুই ভাই। ইংরেজির শিক্ষক পরশকে এবার যুবলীগের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। আর মেয়র সাঈদ খোকন বিতর্কিত হয়ে পড়ায় তার জায়গায় তাপসকে নিয়ে এসেছেন ফুপু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ইঞ্জিনীয়ার ইশরাক হোসেনও প্রার্থী পিতার সূত্রে। তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা একজন স্বনামখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকার সাবেক মেয়র। কিন্তু তার রাজনীতির বিকাশ হয় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি আর শেখ হাসিনার রাজনীতি প্রতিরোধের জন্যে অনেক কাজ করেছেন সাদেক হোসেন খোকা। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা থাকলেও বিএনপির রাজনীতির স্বার্থে স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছেন ইশরাকের বাবা। মেয়র খোকা ব্যাপক দুর্নীতিতেও জড়িয়ে পড়েন। ওই দুর্নীতিতে ইশরাকেরও নাম আছে। দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার এড়াতে সপরিবারের আমেরিকায় চলে যান সাদেক হোসেন খোকা। সেখানে তার ক্যান্সার ধরা পড়ে ও চিকিৎসা চলতে থাকে। মৃত্যু পর্যন্ত আমেরিকাতেই কাটে তার। রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্যে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট হস্তান্তর করেন মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। পাসপোর্ট না থাকায় তার মৃত্যুর পর লাশ আনা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার লাশ দেশে আনার ব্যবস্থা করেন। পিতার লাশের সঙ্গে দেশে ফিরে দেশে ফিরে শেখ হাসিনাকে উৎখাতের শপথ করেন ইশরাক! এর কারনে তিনি আজ প্রার্থী। যদিও গত সংসদ নির্বাচনে দল তাকে প্রার্থী করেনি।

এই নির্বাচনের শুরু থেকে ইভিএম এর বিরোধিতা করে আসছে বিএনপি। এই দলটির বুদ্ধিজীবীরা বলে দিয়েছেন সরকার ফন্দি করে রেখেছে, ইভিএমে নৌকার প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষনা করা হবে! উল্লেখ্য এর আগে ইভিএমে বিএনপির প্রার্থীরা জিতেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি এমন যে একটা দল যখন বিজয়ী হয় তখনই শুধু তার কাছে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়। নির্বাচনের ফল ঘোষনার আগ পর্যন্ত তারা অভিযোগ করতে থাকে। আর এদের কাছে আওয়ামী লীগের কোন রকম জনসমর্থন অথবা ভোটারই নেই! ভোটার-জনসমর্থন ছাড়াই একটা দল এভাবে দাপটের সঙ্গে ক্ষমতায় থাকে! ঢাকার এই ভোটে টাকার মচ্ছব হয়েছে। বিএনপি এই মচ্ছব নিয়ে কোন অভিযোগ করেনি। কারন টাকার মচ্ছবের সঙ্গে তাদের প্রার্থীরাও জড়িত। এই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা প্রমান করেছে প্রায় এক যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকলেও তাদের টাকার কোন ঘাটতি দেখা দেয়নি! তাদের হাতে এখনও এত টাকা!

আগামী ৯৬ ঘন্টা খুব গুরুত্বপূর্ন ঢাকার ভবিষ্যতের জন্যে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর সব আয়োজনের মেয়রদের নেতৃত্বে হবে কীনা এটা ঠিক করবেন ঢাকার ভোটাররা। যে সব প্রতিশ্রুতি মেয়রা দিয়েছেন এরজন্যে দরকার সরকারের সমর্থন। বড় একটা চ্যালেঞ্জ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে হবে। আজকাল ভোটকেন্দ্রগুলো খা খা করে এটি দেশের গণতন্ত্রের জন্যে উদ্বেগের। আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দল যদি নিজেদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আসা নিশ্চিত করেন তাহলে এই ভোটার খরা আর থাকবেনা। ভোটার ভোট কেন্দ্রে না ফিরলে সেই নির্বাচনে কেউ জিতবেনা।

ফজলুল বারী
fazlulbari2014@gmail.com