এই গল্পটা জীবন্ত: স্মাইলি ফাউন্ডেশন 

এই গল্পটা জীবন্ত: স্মাইলি ফাউন্ডেশন 

জিলা স্কুলের ১৯৮৮ ব্যচের পুনর্মিলনীর অনুষ্ঠান চলছে স্কুলের হল রুমে। উদ্বোধনী  অনুষ্ঠানে একটি ছেলে কথা বলছে।

আমার নাম সাইদূর আতিক অপু। ২০১৬ সালে আমি জিলা স্কুলে  নবম শ্রানিতে প্রথম স্থান নিয়ে উত্তির্ন হই। স্মাইলি ফাউন্ডেশন এর পক্ষ থেকে আমাকে একটি লেপটপ উপহার দেওয়া হয়। আমি সাধারণ ঘরের এক পিতৃহীন সন্তান। আমার মার টিউশনির টাকায় আমরা তিন ভাই বোন কোনমতে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। লেপটপ কখনো পাবো ভাবি নাই। আমার এখনো মনে আছে নাহিদ ভাই,  কামাল ভাই,  মাসুদ ভাই আর জিয়া ভাই  আমার হাতে লেপটপ তুলে দিয়ে বলে ছিলো তোমার জন্য এই জিলা স্কুলের নাম একদিন বিশ্বের সবাই জানবে।সেদিনই জানলাম স্মাইলি ফাউন্ডেশন গঠিত হয় ১৯৮৮ ব্যাচ এর কয়েক বন্ধু মিলে লাস ভেগাস এর কোন এক হোটেলে।  আজ আমি গুগল এর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হয়েছি আপনাদের দেওয়া ঐ লেপটপের কারণে। আমি এই ৮৮ এলামনাই এর কাছে কৃতজ্ঞ। এই স্কুলের ক্সছে কৃতজ্ঞ।
ছেলেটার কথা শুনে  পঞ্চাশ বছরের সব এলামনাইদের চোখ আদ্র হয়ে উঠলো। জিলা স্কুলের বিরাট হল রুমের এক কোনায় বসে টিটু এক মনে শুনছিল। হঠাৎ যেন হাড়িয়ে গেল সেই ২০১৫ বন্ধু সভায় আমিরিকায়।
২০১৫ সালের ২৫ অগাস্ট। এয়ার নিউজিল্যান্ডের রোয়িং ৭৮৭ প্লেনটা যখন, এল এ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে টেক অফ করল। টিটুর মনটা একইসাথে প্রসন্ন ও বিষন্ন হুয়ে গেল। একটা অদ্ভুত মিলানকলি সুর বাজতে লাগলো। গত দশ দিন এত দ্রুত কেটে গেল যেন এক পলক। ওরা আট জন স্কুল বন্ধু যারা এখন কর্ম ও অভিভাষণ সুত্রে চারটি  ভিন্ন মহাদেশের বাসিন্দা। একত্রিত হয়েছিল এক বিরল বন্ধুসভায় আমিরিকাতে। পরিবার পরিজন ছাড়া শুধুই তারা।
ছোট খাট মানুষ কিন্তু সিংহ হৃদয়ের অধিকারি বাপ্পি এই সভার উদ্যগক্তা। মিল্টন,  জুয়েল বাংলাদেশ থেকে,  রাসেল আয়রল্যন্ড থেকে,  লম্বা টিটু অষ্ট্রেলিয়া থেকে,  বাপি আমিরিকার ডালাস,  রিপন ফ্লোরিডা থেকে আর পাপ্পু সাউথ ক্যারোলিনা থেকে জমায়েত হয়েছিল লস এঞ্জেলস এ। এ যেন সেই ছোট বেলায় বাংলা চয়নিকা বইয়ের কবিতার মত।
নুরু পুষি আয়শা শফি
সবাই এসেছে
আম বাগিচার তলায় যেন
তারা হেসেছে।।
লস এঞ্জেলস থেকে ড্রাইভ করে সোজা সিন সিটি লাস ভেগাস, তার পর একে একে এরিজোনা রাজ্যের গ্র‍্যান্ড ক্যানিওন,  নেভাডা ডাম্প, অপরুপ সুন্দর জুন ভ্যালি থেকে ভয়ংকর ডেথ ভ্যালি,  ফেয়ার ফিল্ড, সান ফ্রান্সিসকোর সান্তা ক্রুজ, ফিল্ম সিটি হলিউড  এবং সান্তা মনিকা বীচ আরও অনেক জায়গায় যাওয়া হল।
দু রাত তিন দিন সিন সিটিতে থাকলেও আশ্চর্যজনক যে এরা মাত্র এক বিকেলে সাইট সিইং করতে গেল। হোটেলেই কাটাল গল্প করে। সেই জিলা স্কুলের পর পঁচিশ বছর পেড়িয়ে গেছে। তাই যেন গল্পের ঝাপি খুলে বসছিল।  বাইরে যেতে যেন কেউই আগ্রহী নয়।
স্কুল জীবনের কতো স্মৃতি। স্কুল পালিয়ে ইংলিশ সিনেমা দেখে হাসান স্যার এর কাছে ধরা পরা। শাস্তি।নাগ বাবু স্যার এর বেতের বারি, মতিউর রহমান স্যার এর পিছন থেকে দুষ্টমি ধরে ফেলা, ক্লাস ক্যাপ্টেনকে সাথে নিয়ে বেশি করে টিফিন নেওয়া  এগুলো সবই এখন সুখের স্মৃতি।
সবাই মনে করল তাদের হারিয়ে যাওয়া বন্ধু অরিন্দম অপুকেও। অষ্টমি স্নান করতে গিয়ে ব্রম্মপুত্রে চিরদিনের মতো হারিয়ে যায়। বাপ্পির জন্য খুবই স্পর্শ কাতর। কারন ও আর জাফর ছিল তখন অপুর সাথে।  টিটুর জন্যও অবসাদের। অষ্টমি ছুটির আগেরদিন ওরা গিয়েছিল কারিগরি অংকন ক্লাসে এক সাথে। নাগ বাবু স্যার বেজায় কড়া। পেন্সিল না নিয়ে গেলে আঙ্গুলে বেতের বারি পড়ত। টিটুর পেন্সিল ছিল না। অপুকে বোকা বানিয়ে পিক পকেট করে পেন্সিল নিয়ে ক্লাস করল। আর অপু বেচারা শাস্থি পেল। ক্লাস শেষে যখন পেন্সিল ফেরত দিল, অপু না রেগে হেসে শুধু বললো তুই আমাকে মার খাওয়ালি? সেই অপুই পরের দিন সবাইকে বোকা বানিয়ে চলে গেল।
টিটু বলল, কিরে পাপ্পু তর মনে আছে আমরা দুইজন আমিরিকার প্রেসিডেন্ট এর কাছে  চিঠি লিখেছিলাম।  ক্লাস সেভেন এ তখন। তাই না। পাপ্পু বলল হ্যা।মনে পাড়েছে। তুই বাংলায় বলতি আর আমি ইংরেজিতে লিখতাম। প্রেসিডেন্ট,  হোয়াইট হাউজ,  ওয়াশিংটন এই  ঠিকানায় পোস্ট করেছিলাম। মাস তিনেক পর চিঠির উত্তর আসলে খুবই আনন্দ হয়েছিল।
এই পাপ্পুই ত পরে রোডস স্কলার হয়ে আমিরিকায় গেল। প্রেসিডেন্ট এওয়ার্ডও পেল।  ব্রাভো।
বাল্য প্রেম নিয়েও অনেক গল্প। সুমন – নিপু, শাকিল -দিলরুবা, সিজার-রিভার নাটকিয় প্রেম। সাহানার প্রাতি বিপুলের একপেশে প্রেম। কতো স্মৃতি। রাসেল মনে করিয়ে দিল দিনের পর দিন কার্ড খেলার কথা। পুলিশের হাতে ধরা পরা। সবই তারুণ্য।
পাপ্পু হঠাৎ বলল দোস্ত আমরা ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের বন্ধুরা অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে আজকে এই সুদূর আমিরিকায় একত্রিত হয়েছি। পারিবারিক এবং কর্মখেত্রে কিম্বা ব্যবসায় কম বেসি সবারই সাফল্য আছে। কিন্তু আমরা কি এক সাথে কিছু করতে পারি? যাতে বাকি জীবনটা একটা বন্ধনের মাধ্যমে কাটাতে পারি।নিজেদের জন্য অনেক করেছি, অনেক নিয়েছি। এখন ফিরিয়ে দেবার পালা। কিছু কি করা যায়।
টিটু বলল আমরা আমাদের বিশেষ দিন গুলো বিশেষ ভাবে পালন করতে পারি। যেমন ধর রিপন তার বিশতম বিবাহ বার্ষিকী কিম্বা বাপ্পির জন্মবার্ষিকী উদযাপন করল একটা লেপ্টপ কিনে কোন মেধাবী ছাত্রকে উপহার দিয়ে।  এই উপহার টা পেয়ে ছেলে বা মেয়েটার যে আনন্দ হবে, তাই হবে উদযাপন। আমরা একটা ফাউন্ডেশন করে এই কাজ টা করতে পারি। সেই থেকে স্মাইলি ফাউন্ডেশন শুরু। প্রথম বছর আমরা আটজন একটা করে লেপটপ কমিট করলাম।মময়মনসিংহ জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রদের দিয়ে যাত্রা শুরু হল। এই লেপটপ হস্তান্তর এর সময়ে ছাত্রের হাসি মাখা ছবি তুলে স্মাইলি ফাউন্ডেশন এর ক্রেস্টে খোদাই করে লেপটপের স্পনসর কে দেওয়া হয় সুভ্যেনির হিসেবে।  এই অপু ছেলেটার সেই নবম শ্রেণির ছবি সহ সুভ্যেনির বাপ্পির বাসায় আছে। এটা বাপ্পি ও যুথির বিবাহ বার্ষিকী উদযাপন ছিল।এই উদযাপন নিয়ে এক ধরনের গর্ব ও আনন্দ দুটোই হয়। এখন স্মাইলি ফাউন্ডেশন বছরে দুইশ লেপটপ দেয় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের।  যে কেউ তাদের বিশেষ দিন উদযাপন করতে পারে স্মাইলি ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে। অনেক বিদেশিরাও তাদের বিশেষ দিন উদযাপন করে এই স্মাইলি ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে।
স্মাইলি ফাউন্ডেশন নামটা টিটুর দেওয়া। হাসি নাকি স্পর্শকাতর,  সহযে ছড়ায়। এই হাসি ছড়ানোর কাজটাই স্মাইলি ফাউন্ডেশন করে যাচ্ছে। তাই এই নাম।
অপু ছেলেটা তখনো বলে যাচ্ছে স্মাইলি ফাউন্ডেশন গুনগান। কিভাবে আউট সোর্সিং করে তার পরিবারের হাল ধরেছিল এই লেপটপ দিয়ে।
টিটুর কানে আর কিছুই ঢুকছে না। তার মনে একটা ভাবনা খেলে যাচ্ছে, কিভাবে স্মাইলি ফাউন্ডেশনকে অমর করা যায় নিজেদের মৃত্যুর পরও। পুনর্মিলনি শেষ হলে সবাইকে নিয়ে বসতে হবে। জামিলকে বলতে হবে আবারও মিটিং কল করতে।
বিঃ দ্রঃ এটি শুধুই একটি গল্প। এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র বাস্তব। এই চরিত্রগুলোই এই গল্পের প্রান। তাই গল্পটা জীবন্ত এবং চলমান।
আবুহেনা ভুইয়া টিটু
 ১১ ই মার্চ,২০২২
পার্থ, পশ্চিম অষ্ট্রেলিয়া।

You may also like

উলুদাগ পর্বতে প্রতিবিম্ব

তুরস্কের পথে পথে ঘুরেছি অনেক। অবশেষে উলুদাগ পর্বতের