এই হুজুরকে বেশি বেশি ফাউলটক করতে দিতে হবে

এই হুজুরকে বেশি বেশি ফাউলটক করতে দিতে হবে

ফজলুল বারী:হেফাজতের আমীর শাহ আহমদ শফি আবার ফাউল টক করেছেন। তার এবারের ফাউল টক সরাসরি দেশের নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে। নারীকে আবার অবরোধবাসিনী করে রাখার পক্ষে! অনুসারীদের তিনি তাদের মেয়েদের পড়াশুনা ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত সীমিত রাখার জন্যে ওয়াদা করিয়েছেন! তার বক্তব্য ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত পড়লেই মেয়েরা তাদের স্বামীর টাকা-পয়সা গুনে রাখতে পারবে। মেয়েদের এই ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত পড়াতে হবে মাদ্রাসায়। স্কুল-কলেজে না। মেয়েদের স্কুল-কলেজে পড়তে দিলে নাকি ক্লাস এইট-নাইন-টেন-এমএ-বিএ পর্যন্ত পড়তে দিলে মেয়ে খারাপ হয়ে যায়, অন্য পুরুষ নিয়ে যায় এমন কথাও বলেছেন এই হুজুর! তার মাহফিলে ১৫ হাজারের মতো লোক ছিল। তাদের তিনি হাত তুলে ওয়াদা করিয়েছেন যাতে তারা তাদের মেয়েদের ক্লাস-ফাইভের বেশি না পড়ায়। আফগানিস্তানে তালেবান মোল্লারা যা করে ২০১৯ সালের বাংলাদেশে তাই করতে চাইছেন এক হেফাজতি মোল্লা! সরকার যেখানে কিছুদিন আগে তাদের মাদ্রাসা শিক্ষার সনদের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের মূলধারায় নিয়ে আসার পদক্ষেপ নিয়েছে।

হেফাজতের হুজুরের এই ফাউল টকের পর সামাজিক গণমাধ্যমে এই নিয়ে খুব স্বাভাবিক হৈচৈ-শোরগোল চলছে। এই শোরগোলের বিষয়টিকে আমি ইতিবাচক হিসাবে দেখছি। কারন এতে করে একটি আধুনিক মানবিক সমাজের জন্যে ক্ষতিকর সামাজিক শক্তিগুলো চিহ্নিত এবং দূর্বল হবে। কারন বাংলাদেশে এখনও আপনি মানেন অথবা না মানেন এমন কিছু প্রগতি বিরোধী শক্তি আছে যেগুলো দেশের অগ্রগতির প্রতিবন্ধক। আহমদ শফি তার এর আগের ফাউল টক দিয়ে তিনি জানান দিয়েছিলেন তিনি একজন কামুক বৃদ্ধ। এবারে জানিয়ে দিলেন তিনি আসলেও একজন মূর্খও। কাজেই তাকে এমন আরও ফাউল টকের ব্যাপারে উৎসাহ দিতে হবে। তাতে করে জানা হবে তিনি আসলে একটি ফালতু লোক। এবারে তাকে ফালতু প্রমানের একটি উপায় বলে দিচ্ছি। আহমদ শফির এই ফাউট টক বয়ানের মাহফিলে যে ১৫ হাজার লোক হাত তুলে ওয়াদা করেছেন, এক মাস পর তাদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখুন তাদের কয়জন তাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে পড়াশুনা বন্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের লোকজন ওতো বলদ অথবা গরু-ছাগল না। আটরশিতে যত লোক গরু-ছাগল নিয়ে যায় অত লোক যদি জাকের পার্টিকে ভোট দিত তাহলে গোটা তল্লাটে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নামের কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বও থাকতোনা।

আমার ক্ষোভ ২০১৯ সালে এসে বাংলাদেশে এখনও এমন লোকজন আছেন! আমি যখন পায়ে হেঁটে বাংলাদেশ ভ্রমন করি তখন অনেক লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাংলাদেশের মানুষজনের ফাউন্ডেশনের দূর্বলতা নিয়ে একটি সার-সংক্ষেপ পেয়েছিলাম। ব্রিটিশরা যখন এদেশ দখল করে তখন এ অঞ্চলের মুসলমান সমাজের নেতৃত্বে ছিলেন আলেম সমাজ। তারা ইংরেজি শিক্ষায় ছিল অজ্ঞ-মূর্খ। আলেম প্রভাবিত এ অঞ্চলের মুসলমানদের পড়াশুনার ক্ষেত্র ছিল তখন মূলত মাদ্রাসা। সেখানে পড়াশুনা করানো হতো উর্দুতে। কারন মাদ্রাসা শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিতরা তখন ছিলেন উর্দু ভাষী। তখনকার প্রভাবশালী আলেমরা যেহেতু ইংরেজি পড়তে-লিখতে-বলতে পারতোনা, তাই ইংরেজি ভাষা-শিক্ষাকে ইহুদি-নাসারাদের ভাষা-শিক্ষা চিহ্নিত করে অনুসারী মুসলমানদের তারা ইংরেজি শিক্ষায় নিষেধ করেন। আর ব্রিটিশ শাসন আমলের স্কুল-কলেজের পড়াশুনার মাধ্যম ছিল ইংরেজি। তখন ইংরেজি শিক্ষায় দিক্ষিত হয়ে হিন্দুরা জমিদারি এবং প্রভাবশালী সব পদ পায়। আর মুসলমানরা হয়ে পড়ে প্রজা গোষ্ঠী।

রবীন্দ্র-শরৎ সাহিত্যের আব্দুল-গফুর, পাঁচক-মাঝি এসব চরিত্র ছিল মূলত মুসলমান। স্যার সৈয়দ আহমদের আমল থেকে মুসলমানরা বিচ্ছিন্নভাবে ইংরেজি পড়াশুনা শুরু করে। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাগ যখন হয় তখন এ অঞ্চলে সৃষ্টি হয় বিশাল এক শূন্যতার। স্কুল-কলেজের শিক্ষক থেকে শুরু করে অফিস-আদালতের বড় কর্তাদের সিংহভাগ ছিলেন হিন্দু। তাদের প্রায় সবাই ভারতে চলে গেলে সেই শূন্য আসনে যারা গিয়ে বসেন তারা তূলনামূলক অযোগ্য ব্যক্তি। আমাদের বাপ-দাদারা সেই অযোগ্য ব্যক্তিদের সৃষ্টি। তাদের সৃষ্টি আমরা। কাজেই আমাদের যে পদে পদে যতো অযোগ্যতা-দূর্বলতা, এসবের কারনতো ঐতিহাসিক। সেই ব্রিটিশ আমলের মুসলমান সমাজের অন্ধকার যুগে বেগম রোকেয়া-সুফিয়া কামালদের জন্ম হয়েছিল। তাদের প্রতিবাদী পদক্ষেপে মুসলিম নারী শিক্ষার জাগরন শুরু হয়। সেখান থেকে আজকের বাংলাদেশে শেখ হাসিনা চতুর্থ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী। খালেদা জিয়া এখানে তিন মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গীতের স্পিকার থেকে শুরু করে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি-মন্ত্রী-সচিব-ডিসি-এসপি থেকে কোথায় আজ নারীর অধিষ্ঠান নেই?

গত কয়েকদশকে দেশজুড়ে বিশাল বিপ্লব সাধন হয়েছে নারী শিক্ষায়। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। বিশেষ একটি পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক নারী শিক্ষা-ভাতার ব্যবস্থা করেছে রাষ্ট্র। দেশের যে অগ্রগতি এরজন্যে বিশেষ অবদান আজকের নারী শিক্ষার বিস্তৃতি। শিক্ষিতা মায়েরা সৃষ্টি করছেন সন্তানের শিক্ষার ভিত। যে মা-বাবা পড়াশুনার সুযোগ পাননি তারাও চান তাদের মেয়েটিও যাতে পড়াশুনা করে সৃষ্টি করতে পারে নিজের জীবনের আলোকজ্জ্বল গতিপথ। গার্মেন্টস শিল্পের কারনে বাংলাদেশ যে উদীয়মান বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি এর কারনও নারী। আর সেই দেশে একজন মোল্লা তার অনুসারীদের শপথ করাচ্ছেন তারা যাতে তাদের মেয়েদের ক্লাস ফোর-ফাইভের বেশি না পড়ায়!

এ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষজনের পেরেশান না হলেও চলবে। এই মোল্লাদের পরিনতি সম্পর্কে একটা উদাহরন দেই। আমি বৃহত্তর সিলেট এলাকার লোক। বৃহত্তর সিলেট এলাকার যে সব লোকজন বিলাতে থাকেন স্থানীয়ভাবে তাদেরকে বলা হয় লন্ডনী। মূরব্বিদের কাছে শুনেছি এমনও সময় ছিল যখন গ্রামের লন্ডনী বাড়িতে দাওয়াত খেতেও যেতে চাইতেননা অনেক রক্ষনশীল মৌলভী! বলতেন এরা বিলাতে ইহুদি-নাসারাদের দেশে হারাম খায়, হারাম ব্যবসায় কাজ করে টাকা নিয়ে আসে দেশে! কাজেই তাদের বাড়ির দাওয়াত খাওয়া মানে হারাম খাওয়া! কিন্তু এক পর্যায়ে পরিস্থিতি পাল্টে এমন হয় যে মৌলভীরা পরবর্তিতে লন্ডনী বাড়ি ছাড়া দাওয়াতেও যেতে চাইতেননা। জগতের সব সম্পর্ক অর্থনৈতিক। ওয়াজের মাধ্যমে ভালো আয়-রোজগারের আশায় সাঈদী এক সময় বারবার বিলাতে যেতে চাইতেন। ইরাক যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কক্সবাজার এলাকার এক ওয়াজী বক্তৃতার কারনে সাঈদীর সেই বাজার বন্ধ হয়। সিলেটের কয়েক অঞ্চলে এক শ্রেনীর মোল্লা অনেক বছর টেলিভিশন দেখাও বন্ধ রেখেছিল! সে অবস্থা কি এখন আর আছে?

কাজেই এই হুজুরও ফালতু চিহ্নিত হবে। পথও বলে দিলাম। ইনি যে ১৫ হাজারকে শপথ করিয়েছেন তাদের ওপর জরিপ করালে দেখা যাবে কেউ তার কথা শোনেনি। কারন নারী শিক্ষা শুধু ব্যক্তি-পরিবার-সমাজের সমৃদ্ধির জন্যে না পৃথিবীর কোন ধর্মই এর বিপক্ষে না। শফি হুজুররা তাদের মাদ্রাসার ছাত্রদের স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছেন বলে বাংলাদেশে স্মার্টফোনের বাজারে হাহাকার পড়ে যায়নি। এরমাঝে বাংলাদেশের অনেক ধর্মীয় নেতাও আহমেদ শফির বিরুদ্ধে বলতে শুরু করেছেন। একবার রিপোর্টের কাজে মিশরের কায়রোয় গিয়ে আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বাংলাদেশি ছাত্রের সঙ্গে ছিলাম বেশ কিছুদিন। ওই ছেলেগুলোও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের। দেশে তারা মাদ্রাসায় পড়তেন।

মিশর সরকারের বৃত্তি নিয়ে সেখানে পড়তে গেছেন। মিসর সরকারের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তির কারনে বাংলাদেশের মাদ্রাসা ছাত্রদের সে দেশে পড়াশুনায় যেতে বৃত্তি দেয়া হয় এটিও বাংলাদেশের অনেক মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা কম জানেন। কায়রোর সেই বাংলাদেশি ছাত্ররা আমাকে তারা বলেন, দেশ থাকতে মাদ্রাসার ছাত্র হিসাবে লজ্জায় তারা শার্ট-প্যান্টও পরতেননা। বিদেশে পড়তে এসে তাই পরেন। বিদেশে পড়াশুনা করতে না এলে জানতেন না ইসলাম কতোটা আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ধর্ম। সারা পৃথিবীর মুসলিম স্কলাররা পড়াশুনা-গবেষনার জন্যে যায় আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আহমেদ শফিদের সংকটও পড়াশুনার। আসলে এরা কুয়োর ব্যাঙ। আমরা যখন যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গেলাম, গণজাগরন ঘটলো সেখানে। আর তারা সেখানে গেলো বা তাদের ভাড়ায় পাঠানো হলো নাস্তিক খুঁজতে! এরপর তাদের দিয়ে তান্ডব ঘটানো হলো ঢাকার রাস্তায়। কোরানও পুড়লো। ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে বাঁশের কেল্লায় বলানো হলো লাশের মিথ্যা গল্প। এরমাধ্যমে দেশের মানুষ জানলো এরা ডাহা মিথ্যাও বলে! যারা মিথ্যা কথা বলে তারা কী করে ধর্মীয় নেতা হয়? এরপর দেখা গেলো নারী দেখলে তাদের মুখ দিয়ে লালা ঝরে! রেলের জমিখোরও তারা হয়! এখন আবার তারা নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নারীকে করতে চায় অবরোধবাসিনী! তাদের কাছে নারী শুধুই হবে ভোগের! শুধুই সাঈদীর লইট্যা ফিশ ময়না পাখি! এদের ফাউল টক করতে দিন। এভাবে স্রোতের বিপরীতে প্রগতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা হোক চিহ্নিত দেশের বর্জনীয় ফালতু লোক। কারন শিক্ষার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়ায় তারা ফালতু ছাড়া আর কী? জাগো নারী। জাগো বাংলাদেশ।

ফজলুল বারী