বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী আর নেই।

বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী আর নেই।

0

বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী আর নেই। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (৭ মে) ভোর সাড়ে চারটার দিকে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।

সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পর সোমবার (৬ মে) সকালে তৃতীয় দফায় হার্ট অ্যাটাক হয় সুবীর নন্দীর। এর আগে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল তারঁ।

১৬ দিন রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) লাইফ সাপোর্টে ছিলেন সুবীর নন্দী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩০ এপ্রিল ঢাকার সিএমএইচ থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় একুশে পদকপ্রাপ্ত এই সংগীতশিল্পীকে। সেখানে দফায় দফায় হার্ট অ্যাটাক হয় তাঁর।

গত ১৪ এপ্রিল রাতে সিলেট থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ট্রেনে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুবীর নন্দী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও কন্যা। রাত ১১টার দিকে তাকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে হার্ট অ্যাটাক করেন এই নন্দিত শিল্পী। এরপর তাকে দ্রুত লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হার্টের অসুখে ভুগছিলেন সুবীর নন্দী।

৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আড়াই হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন সুবীর নন্দী। রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রে নিয়মিত গাইছেন এখনও। ১৯৮১ সালে তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে। ছবির নাম ‘সূর্যগ্রহণ’।

সুবীর নন্দী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন চারবার। সংগীতে অবদানের জন্য এ বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক পান তিনি।

তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে- আমার এ দুটি চোখ, বন্ধু হতে চেয়ে, আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি, চাঁদের কলঙ্ক আছে, দিন যায় কথা থাকে, একটা ছিল সোনার কন্যা, হাজার মনের কাছে, কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, পাহাড়ের কান্না, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার প্রভৃতি।

প্রাথমিক জীবন
সুবীর নন্দী হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানায় নন্দী পাড়া নামক মহল্লায় এক কায়স্থ সম্ভ্রান্ত সঙ্গীত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।।তার নানা বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাদেআলিশা গ্রামে. তার পিতা- সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসক ও সঙ্গীতপ্রেমী। তার মা পুতুল রানী চমৎকার গান গাইতেন কিন্তু রেডিও বা পেশদারিত্বে আসেন নি। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভাই-বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে। তবে সঙ্গীতে তার হাতেখড়ি মায়ের কাছেই।বাবার চাকরি সূত্রে তার শৈশবকাল চা বাগানেই কেটেছে। পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত বাগানেই ছিলেন। চা বাগানে খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি স্কুল ছিল, সেখানেই পড়াশোনা করেন। তবে পড়াশোনার অধিকাংশ সময়ই তার কেটেছে হবিগঞ্জ শহরে। হবিগঞ্জ শহরে তাদের একটি বাড়ি ছিল, সেখানে ছিলেন। পড়েছেন হবিগঞ্জ গভঃ হাইস্কুলে। তারপর হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সুবীর নন্দী সেকেন্ড ইয়ারে পড়তেন।

কর্মজীবন
১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণী থেকেই তিনি গান করতেন। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার গানের ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানে ছিলেন বিদিত লাল দাশ। সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিং এর মধ্য দিয়ে। প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’ -এর গীত রচনা করেন মোহাম্মদ মুজাক্কের এবং সুরারোপ করেন ওস্তাদ মীর কাসেম। ৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত সূর্যগ্রহণ চলচ্চিত্রে। ১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম “সুবীর নন্দীর গান” ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। তিনি গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করেছেন।

চলচ্চিত্রের তালিকা
সূর্যগ্রহণ (১৯৭৬)
অশিক্ষিত (১৯৭৮)
দিন যায় কথা থাকে (১৯৭৯)
মহানায়ক (১৯৮৪)
চন্দ্রনাথ (১৯৮৪)
শুভদা (১৯৮৬)
পরিণীতা (১৯৮৬)
রাজলক্ষী শ্রীকান্ত (১৯৮৭)
রাঙা ভাবী (১৯৮৯)
পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১)
স্নেহ (১৯৯৪)
বিক্ষোভ (১৯৯৪)
মায়ের অধিকার (১৯৯৬)
আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭)
শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯)
চন্দ্রকথা (২০০৩)
মেঘের পরে মেঘ (২০০৪)
শ্যামল ছায়া (২০০৪)
হাজার বছর ধরে (২০০৫)
শত্রু শত্রু খেলা (২০০৭)
চন্দ্রগ্রহণ (২০১৮)
আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা (২০০৮)
অবুঝ বউ (২০১০)
দুই পুরুষ (২০১১)
মাটির পিঞ্জিরা (২০১৩)
পুরস্কার ও সম্মাননা
শিল্পকলায় একুশে পদক (২০১৯)
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
১৯৮৪: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – মহানায়ক
১৯৮৬: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – শুভদা
১৯৯৯: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – শ্রাবণ মেঘের দিন
২০০৪: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – মেঘের পরে মেঘ
২০১৫: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী – মহুয়া সুন্দরী
বাচসাস পুরস্কার
১৯৭৭: সেরা পুরুষ কন্ঠশিল্পী
১৯৮৫: সেরা পুরুষ কন্ঠশিল্পী – শুভরাত্রি
১৯৮৬: সেরা পুরুষ কন্ঠশিল্পী – শুভদা

কৃতজ্ঞতাঃ বাংলাট্রিবিউন ও উইকিপিডিয়া

Facebook Comments

You may also like

মানবাধিকারের খেতাব নিয়ে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে এখন রোহিঙ্গা একটি গালির নাম!

ফজলুল বারী:রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে মানবাধিকারের খেতাব নিয়ে