সালমান শাহ যা ধারন করতে পারেনি

সালমান শাহ যা ধারন করতে পারেনি

0

ফজলুল বারী: সালমান শাহ’র মৃত্যুর রিপোর্ট তখন আমি অনেকদিন ধরে অনুসরন করেছি। সেই সময়ের তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনায়কের হঠাৎ মৃত্যুর ঘটনা ঢাকার সিনেমা জগতের পাশাপাশি দেশের মানুষকে থমকে দিয়েছিল। শোকার্ত করেছিল। কারন সালমান তখন সিনেমা দর্শকদের আবার সিনেমা হলে ফেরত নিয়েছিলেন। সালমান হয়ে ওঠেন নতুন প্রজন্মের আইডল। সালমানের পর রিয়াজরা সালমান হবার চেষ্টা করেছিলেন। পারেননি। রাজ্জাক, উজ্জ্বল, জাফর ইকবালদের যুগের শেষে নতুন ধুমকেতুর আবির্ভাব ঘটেছিল সালমান শাহকে ঘিরে। শুধু তাঁর পিছনে বিপুল লগ্নি করেছিল ঢাকাই সিনেমা। কিন্তু সালমানের ওই অভাবিত মৃত্যু সবাইকে থমকে দেয়। ধুমকেতুর মতোই তাঁর উত্থান-মৃত্যুর মাধ্যমে পতন দুটোই ঘটেছে। ঢাকার সিনেমা সেই ধাক্কা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

আমি মূলত রাজনীতির রিপোর্টার। কিন্তু আমার পত্রিকা জনকন্ঠ যখন যে রিপোর্ট পাঠক বেশি পছন্দ করতো সেই রিপোর্টের পিছনে আমাকে নিয়োগ করতো। ইরাক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর ইলিশের রিপোর্ট করতে চাঁদপুরে পাঠানো হয়েছিল। এতে করে রিপোর্টার হিসাবে আমার সুবিধা হতো এই জন্যে যে আমি প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় থাকতাম। আমার রিপোর্ট কখনো একসেস করা যেতোনা। একটা পত্রিকায় অনেক রিপোর্টার থাকেন। প্রতিদিন অনেক রিপোর্ট তৈরি-কম্পোজড হয়। কিন্তু জায়গার অভাবে সব রিপোর্ট ছাপা হয়না। অনেক রিপোর্ট একসেস হয়। সেই সব একসেস রিপোর্টের কোন রিপোর্ট পরের দিন পত্রিকার ভিতরে পাতায় ছাপা হয়। কোনটি কোনদিন আর ছাপা হয়না। সালমান শাহকে নিয়ে আমার রিপোর্টগুলো তখন খুবই পাঠক প্রিয় হয়েছিল।

কিন্তু ওই রিপোর্টগুলোয় ক্ষুব্দ হয়েছিলেন সালমানের শশুর সাবেক ক্রিকেটার ও জাতীয় দলের অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা। আমার অফিসে তিনি এ নিয়ে নালিশও করেছেন। কারন আমার সেই রিপোর্টগুলোয় শাবনুরের সঙ্গে সখ্যকে কেন্দ্র করে স্ত্রী সামিরার সঙ্গে সালমানের খারাপ সময়ের বৃত্তান্ত ছিল। সালমানের মা তৎকালীন জাতীয় পার্টির নেত্রী নীলা চৌধুরী তখন প্রায় প্রতিদিনই আমার সঙ্গে কথা বলতেন। সালমান সিনেমার জগতে আসার আগে এরশাদের বান্ধবী হিসাবে মিডিয়ায় আলোচিত ছিলেন নীলা চৌধুরী। আর ছেলে সিনেমার জগতে পা দিয়েই  তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলে তিনি আলোচনায় আসেন সালমান তথা ইমনের মা হিসাবে। সেই নীলা চৌধুরী পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। পরে স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যান। নীলা চৌধুরীর ভাই কুমকুম সিলেট এমসি কলেজে আমার সহপাঠী ছিলেন।

সোহানুর রহমান সোহানের কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবির মাধ্যমে প্রথম ছবিতেই সালমান-মৌসুমী জুটি সুপার ডুপার হিট হয়। লাক্স ফটো সুন্দরী থেকে সিনেমায় আসেন আজমেরি জামান মৌসুমী। সিলেটের ছেলে ইমন তথা সিনেমার সালমানের সে রকম রূপালি জগতের ছোঁয়া ছিলোনা। মুম্বাইর রিমেক ছবির ঢাকাই সংস্করনে সালমান-মৌসুমীকে দেখে বোঝার উপায় ছিলোনা এটিই তাদের প্রথম ছবি। প্রথম ছবির নায়িকা মৌসুমী হলেও সালমান তখনকার প্রায় সব নায়িকার সঙ্গে ছবি করেছেন। কিন্তু শাবনুর ওরফে নুপুরের সঙ্গে করেছেন সবচেয়ে বেশি ছবি। এই জুটিকে নিয়ে তখন কবরী-ফারুকের ‘সুজনসখী’ ছবিটিও রিমেক হয়। সালমান-শাবনুরের অন্তরঙ্গ সময় ঢাকাই সিনেমার জগতের পাশাপাশি সালমান-সামিরার সংসারেও ঝড় তোলে। এই ঝড়ে দুনিয়া থেকেও হারিয়ে গেছেন সালমান। কিন্তু তখন শাবনুরও আমার সঙ্গে কথা বলতেননা। তাঁর হয়ে কথা বলতেন তাঁর ছোটবোন ঝুমুর।

প্রেম করে সামিরাকে বিয়ে করেছিলেন সালমান। কিন্তু তাঁর মায়ের সঙ্গে সামিরার পরিবারের সম্পর্ক ভালো ছিলোনা। মা নীলা চৌধুরীর সন্দেহ ছিল সামিরার পরিবার সালমানকে খুন করিয়েছে। তাঁর অভিযোগ ছিলো সালমানের তারকাখ্যাতি সামিরার পরিবার সহ্য করতে পারছিলোনা। ঢাকার তৎকালীন আন্ডার ওয়ার্ল্ডের গডফাদার আজিজ মোহাম্মদ ভাইর সঙ্গেও সামিরার পরিবারের যোগসাজশের সন্দেহ করতেন নীলা চৌধুরী। প্রতিদিন নিজের কথাগুলো আমার কাছে সিলেটি ভাষাতেই টেলিফোনে তিনি বলতেন। সালমানকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে না নেয়া, তাঁকে খবর না দেবার জন্যে সামিরা ও তার পরিবারকে দোষারোপ করতেন নীলা চৌধুরী। মূলত তাঁর দোষারোপের ভিত্তিতেই সালমানের মৃত্যু নিয়ে মামলা করেন সালমানের বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী। সামিরা কেনো এ নিয়ে কোন মামলা করলোনা এ নিয়েও তিনি প্রশ্ন রাখেন। মরদেহের সঙ্গে সিলেটে যাননি সামিরা। এ নিয়েও দোষারোপ ছিল সালমানের মায়ের। মূলত আর কোনদিনই সিলেটে সালমানের বাড়িতে যাননি সামিরা। সালমানের মৃত্যুর মাধ্যমে শশুরবাড়ির সঙ্গেও সামিরার সম্পর্কের ইতি ঘটে। আর সালমানের মৃত্যুর পর অস্থির শাবনুরও আর ঢাকার সিনেমায় থিতু হতে পারেননি। খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে থিতু হন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। শাবনুর এখন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। মাঝে মাঝে সোনালী অতীত সংঘ খুঁজতে বাংলাদেশে যান।

সালমানের রিপোর্ট করতে গিয়ে আমার কখনো মনে হয়নি যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। বরঞ্চ মনে হয়েছে এত অল্প বয়সে পাওয়া যশ-খ্যাতি-অর্থ-বিত্তের চাপ ধারন করতে পারেননি সালমান। প্রতিটি মানুষের সাফল্য ধারন করতে পারাটাও বিশেষ এক যোগ্যতা। শিল্পীরা একটু বেশি আবেগপ্রবন হয়। আবেগের বশে সালমান যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন ওই সময়ে তাকে সাপোর্ট দেবার কেউ ছিলোনা। মূলত মা নীলা চৌধুরী নারাজিকে কেন্দ্র করে এই মামলাটির তদন্ত প্রক্রিয়া এতোদিন ঝুলে ছিল। আগে স্বামী কমর উদ্দিন চৌধুরীকে দিয়ে নারাজি দেয়াতেন নীলা চৌধুরী। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজে নারাজি দিতেন। সালমান যেহেতু পরিচিত মুখ তাই তার মা-বাবার নারাজি সব সময় গুরুত্ব পেয়েছে। আমার ধারনা বিদেশ থেকে পিবিআইর তদন্তেও নারাজি দেবেন নীলা চৌধুরী। হযরত শাহ জালালের (রঃ) মাজারে ঢোকার পথে যেখানে সালমানের কবর হয়েছে সেটিও বিশেষ উল্লেখ্য। সে কারনে বাংলাদেশের নানা প্রান্তের মানুষ যখন শাহজালালের মাজারে যান, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ সেই সুযোগ যান সালমানের কবরেও। তাদের কেউ হয়তো সেখানে একটি ফুল রেখে আসেন। কেউ ফেলে আসেন ভালোবাসার অশ্রুবিন্দু। সালমানকে ভক্তরা মন থেকেই ভালোবেসেছিলেন।

ফজলুল বারী
fazlulbari2014@gmail.com

 

Facebook Comments

You may also like

লেবাননের যুদ্ধকালীন বাংলাদেশি

ফজলুল বারী: ফেসবুক যে আমাদের কত সম্পর্ক ফিরিয়ে দেয়!