ফিরে আসুন প্রিয় নাসিম ভাই। বাংলাদেশ বিরোধী রাজাকারদের মোকাবেলায় আপনাকে দরকার।

ফিরে আসুন প্রিয় নাসিম ভাই। বাংলাদেশ বিরোধী রাজাকারদের মোকাবেলায় আপনাকে দরকার।

0

ফজলুল বারী: এখনও সংকটাপন্ন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিমের জীবন ভবিষ্যত। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরনের পর শুক্রবার তাঁর মাথায় জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। স্ট্রোক রোগটি সম্পর্কে যারা জানেন তারা জানেন এটি কত বিপদজ্জনক।
যাদের স্ট্রোক করে তিনি বেঁচে গেলেও তাদের দেহের কোন একটি অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতিসাধন করে এই রোগ। শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে মোহাম্মদ নাসিম হাসপাতালে ভর্তির পর তাঁর করোনা শনাক্ত হয়।
এরপর নিবিড় চিকিৎসায় করোনায় ফুসফুসের সংক্রমন যখন প্রায় নিয়ন্ত্রনে চলে আসছিল তখন তাঁর স্ট্রোক করলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর চিকিৎসার দেখভাল করছেন।
বাংলাদেশের এই প্রধানমন্ত্রী একজন ফুলটাইমার বলে সর্বক্ষন সবকিছুর দেখভাল নিজে করেন। নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়াতে তিনি অনেকের মা অথবা বোনের মতোও। তাঁর একজন কড়া সমালোচক ডাঃ জাফর উল্লাহ চৌধুরীর চিকিৎসা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি ভিভিআইপি কেবিন ডাঃ জাফর উল্লাহর জন্যে ঠিক করে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ জাফর উল্লাহ এখনও তাঁর হাসপাতাল গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের চিকিৎসাতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন।
মোহাম্মদ নাসিমের জন্যে সিএমএইচকে বলে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবস্থা অনুকূল থাকলে হয়তো শুক্রবারই তাঁকে সিএমএইচে স্থানান্তর করা হতো। এরমধ্যে বিপত্তি ঘটালো স্ট্রোক। অস্ত্রোপচারের পর এই সময়ে আগামী ৪৮ ঘন্টা খুব গুরুত্বপূর্ন।
এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেক সংবেদনশীল। তাদের অনেকের মাঝে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সম্পর্কে অনেক অভিযোগ। এসবের সত্যমিথ্যা দুটি দিক আছে। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কখনও একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী নন।
তাদের অভিযোগের জবাব দিতে এই লেখা নয়। একজন রিপোর্টার হিসাবে বিএনপি আমলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফের সময় থেকে অনেক কিছু জানি। এখন এ সবের গবেষনার সময় নয়।
দেশের একজন গুরুত্বপূর্ন রাজনৈতিক নেতা এখন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষনে। তাঁকে আগে আমরা সবাই মিলে বাঁচাই। ফাঁসি পরে দেয়া যাবে। মৃতদেহকে ফাঁসি দেয়া গেলেতো জিয়ার মাজার বলে কিছু ঢাকায় থাকতোনা।
জাতীয় সংসদ ভবনের এক কর্নারে খান এ সবুর সহ দেশের তিন বড় রাজাকারকে কবর দিয়েছেন জিয়া! তাঁর জীবন যদি দীর্ঘায়িত হতো তাহলে ওই চত্বরটি হয়তো দেশের বড় রাজাকারদের কবরস্থান হয়ে যেত!
‘স্বাধীনতার ঘোষক’ জাতীয় সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ন এলাকায় কেনো বেছে বেছে বড় দেখে রাজাকারদের কবর দেয়া হচ্ছিল সে প্রশ্নও এই প্রজন্মের মধ্যে নেই! সংসদ ভবনে রাজাকারের গোরস্তান বানানোর নকশাও করেননি লুই কান।
আমাদের প্রজন্ম যখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সাংবাদিকতায় আসি তখন মোহাম্মদ নাসিম উদীয়মান নেতা। তখন এমন সব দলের নেতাদের সঙ্গে রিপোর্টারদের ব্যক্তিগত-পারিবারিক সম্পর্ক।
আজকের মতো এত পত্রিকা-মিডিয়া সাংবাদিকও তখন দেশে ছিলোনা। তখনই মোহাম্মদ নাসিম সম্পর্কে মজার একটি তথ্য জানি। বঙ্গবন্ধু যখন পাবনায় ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাসায় প্রথম যান তখন নাসিম বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যাচ্ছিলেন!
কারন নাসিম তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। আর ছাত্র ইউনিয়নের তরুন নেতা কর্মীদের কাছে শেখ মুজিব তখন একজন বুর্জোয়া নেতা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট। আমাদের রাজনৈতিক পরিবারগুলোতে এমন কত চরিত্র ছিল!
কত মুক্তিযোদ্ধার বাবা ছিলেন রাজাকার! কত মুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীন হবার পর দেশে ফিরে বাবাকে গুলি করে হত্যা করেছে অথবা বাবাকে রক্ষা করেছে! এইসব সামাজিক দ্বন্দ্ব অথবা বন্ধন নিয়েইতো আমাদের বাংলাদেশ।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি অথবা পাঁচদলীয় জোটের নেতা, ছাত্র নেতাদের সঙ্গে আমাদের রিপোর্টারদের সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের। এসব নেতাদের অনেকে তখন হুলিয়া মাথায় আত্মগোপন থাকতেন।
ওই অবস্থাতেও তারা আমাদের দেখা দিতেন। কারন তারা আমাদের বিশ্বাস করতেন। আর আমি যেহেতু তখন সারা বাংলাদেশ পায়ে হেঁটে ঢাকা আসা একমাত্র রিপোর্টার, আমার তখন আলাদা একটি আদর-কদর ছিল।
১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এলো বিএনপি। আওয়ামী লীগের আন্দোলন সংগ্রামে মোহাম্মদ নাসিম আরও ঘনিষ্ট হন রিপোর্টারদের। কাদের সিদ্দিকী যখন দেশে ফিরে আসেন তখন তাঁকে নিয়ে অনেক হৈচৈ।
অনেকে তখন এমনও লিখছিলেন কাদের সিদ্দিকী বুঝি আওয়মী লীগের পরবর্তী সাধারন সম্পাদক! তখন আমাকে বলা মোহাম্মদ নাসিমের একটি বক্তব্য এখনও কানে বাজে।
আমাকে তিনি বলেছিলেন কাদের সিদ্দিকীর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হতে সময় লাগবে। কারন আওয়ামী লীগ এমন দল নয় যে একজন এলেন আর সাধারন সম্পাদক হয়ে গেলেন!
সেই কাদের সিদ্দিকী নিজেই ছিটকে পড়েছেন আওয়ামী লীগের মূলধারা থেকে। আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, মোহাম্মদ নাসিম এরাও কোন দিন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হননি।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর মোহাম্মদ নাসিম টেলিফোন মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন। তখনই সিটি সেল ফোনের একচেটিয়া বাজারে গ্রামীন ফোনকে অনুমোদন দেয়া হয়। গ্রামীন ফোনেরও তখন ইনকামিং কলচার্জ ছিল।
অর্থাৎ আপনার ফোনে কেউ ফোন করলে সে জন্যেও আপনাকে একটি চার্জ দিতে হতো। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার তখন মোহাম্মদ নাসিমকে দিয়ে সেই ইনকামিং কলচার্জ নামের জুলুমটি বিলোপ করায়।
এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস তখন এর বিরুদ্ধে পাঁচ মার্কিন কংগ্রেসম্যানকে দিয়ে এর বিরুদ্ধে একটি চিঠিও লিখিয়েছেন! চিঠির কূটনৈতিক ভাষাটি ছিল এমন, ডক্টর ইউনুস আমাদের বন্ধু। আমরা তার ভালোমন্দের খোঁজ রাখি!
এমন চিঠি একসময় দেশে আসার পর সরকারগুলোয় কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যেত। এরশদের সময় একবার ডক্টর কামালকে গ্রেফতার করলে হেনরি কিসিঞ্জার ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন কামাল সাহেবের শরীর কেমন আছে।
ওই ফোন পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর কামালকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু শেখ হাসিনা-মোহাম্মদ নাসিম ওসব চিঠিতে তখন তাতে পরোয়া না করায় তারা আর সুবিধা করতে পারছিলোনা।
তখন মিডিয়ায় আরেকটি মজার ঘটনা ঘটে। একটি ফোন পেতে তখন একটি সংযোগ ফী সহ তাদের একটি সেটও কিনতে হতো। সাংবাদিকদের যে আর্থিক অবস্থা ছিল তাদের অনেকের কাছে একটা ফোন পাওয়াও ছিল অনেকটা স্বপ্নের বিষয়!
মোহাম্মদ নাসিম তখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংবাদিককে সংযোগ সহ একটি ফোন উপহার দেন। শুধু মাসিক চার্জ অথবা রিচার্জের ব্যয়টি তখন সেই সাংবাদিকদের বহন করতে হতো।
তখন মোহাম্মদ নাসিম যে সব সাংবাদিকদের ফোন দেন সে তালিকাতেও আমার নাম ছিলোনা। কারন তিনি জানতেন আমার একটি ফোন আছে। গ্রামীন ফোন প্রথম বাজারে আসার পর জনকন্ঠ অফিস রিপোর্টারদের জন্যে দুটি ফোন কেনে।
ওই দুটি ফোনের একটি আমাকে ব্যবহারের জন্যে দেয়া হয়। এ খবরও জানতেন মোহাম্মদ নাসিম। এরজন্যে আমরা সঙ্গে কোনদিন তাঁর দেনা-পাওনার সম্পর্কটি হয়নি অথবা ছিলোনা।
আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি ছিল রিপোর্টের। তখন দেশের নানা এলাকায় বোমা হামলার ঘটনা ঘটছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম যখন স্পটে যেতেন তখন অনেক সময় আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন।
তখন দেশের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থী সংগঠনগুলোকে তিনি আমার একটি সিরিজ প্রতিবেদন ‘রক্তাক্ত জনপদ’ বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কুস্টিয়ার সিরাজ বাহিনীর গডফাদার ছিলেন মাহবুবুল আলম হানিফ।
ঢাকায় তখন কেউ তাকে সেভাবে চিনতেননা। তখন তিনি ব্যারিষ্টার আমির উল ইসলামের রেফারেন্সে জনকন্ঠ অফিসে দেখা করতে আসেন। ‘আতংকিত খুলনা’ সিরিজটি চলার সময় বড় বিপর্যয় ঘটে।
সেই রিপোর্ট বন্ধ করতে না পেরে খুলনার গডফাদার লিটুর উদ্যোগে জনকন্ঠের যশোর অফিসে সাংবাদিক শামছুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই রিপোর্টগুলো অনুসরন করে ব্যবস্থা নিচ্ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।
চরমপন্থীদের আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানেও আমাকে তিনি সঙ্গে নিয়ে যান। পার্বত্য শান্তি চুক্তির আগেপরে আমরা এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামেও অনেক স্পটে গেছি একসঙ্গে। তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ সম্পর্ক ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধের সময়।
আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায় নেই। কিন্তু যুদ্ধকভার করতে যাওয়া একজন বাংলাদেশি সাংবাদিককে প্রতিদিন ফোন করে তিনি তার খোঁজখবর নিতেন! ইনিই এমন আলাদা মিডিয়া বান্ধব একজন নাসিম ভাই।
২০০৭ সাল থেকে আমি বিদেশে। আওয়ামী লীগের নতুন আমলটা দেখি দূর থেকে। এই সময়ে দেশের নানান অগ্রগতি, কে আমীর কে ফকির এর সবকিছুও দূর থেকে দেখা। একসময় বাংলাদেশের বাজেটের আগে অর্থমন্ত্রী প্যারিস যেতেন।
প্যারিস কনসোর্টিয়ামের বৈঠকের টেবিলে ব্রিফকেস খুলে এটাসেটা কাগজ বের করে অর্থমন্ত্রী আকুলি বিকুলি করে বলতেন টাকা দিন বাজেট করবো। সেই বাংলাদেশ এখন ভিন্ন উচ্চতায়। নিজের টাকায় পদ্মাসেতু করছে আমাদের বাংলাদেশ!
দুনিয়ার মুরব্বিদের আপত্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ স্বাধীন করাটা ছিল একটি বেয়াদবি। জীবন দিয়ে এর দায় শোধ করতে হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। সেই বাংলাদেশ আরেকটি বেয়াদবি করলো!
নিজের টাকায় পদ্মা সেতু বানানো হচ্ছে আরেকটি বেয়াদবি বাংলাদেশের। এরজন্যে বাংলাদেশকে শাস্তি দিতে কে কোথায় নিত্য দৌড়াদৌড়ি করেন তা ওয়াকিফহলরা জানেন। বাংলাদেশের এই প্রধানমন্ত্রী মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সহজে সাক্ষাতও দেননা।
কারন একজন যুগ্ম সচিব মর্যাদার রাষ্ট্রদূতকে কথায় কথায় সাক্ষাত দেবার মতো অবসরও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেই। বিদেশে বাংলাদেশের কোন রাষ্ট্রদূতও এসব সুযোগ পাননা।
কিন্তু এসবকে বেয়াদবি চিহ্নিত করতে বাংলাদেশের কোন কোন মিডিয়া শয়তান কোথায় কাকে উস্কান সে তথ্যগুলোও কোন গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশের এই সরকারকে এমন দেশি-বিদেশি নানান স্বার্থ-ধান্দালদের নজরে রেখে দেশ চালাতে হয়।
সেই বাংলাদেশ এখন করোনা মহামারীর কারনে থমকে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতির কারনে থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। এই সময়ে মারা যাচ্ছেন দুনিয়ার মানুষ। বিশেষ করে বয়স্করা এখন বেশি ঝুঁকির মধ্যে।
এরমাঝে দেশের আটশোর বেশি মানুষ প্রান দিয়েছেন করোনায়। প্রতিদিন মৃত্যু বাড়ছে। বিশ্ব ফুটবলে বাংলাদেশে ব্রাজিলের সমর্থক বেশি। সে ব্রাজিলেও মারা গেছেন ৩৪ হাজারের বেশি।
আমাদের নাসিম ভাই এখনও জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে। আসুন তাঁর জন্যে আমরা দুই হাত তুলি একবার। ফিরে আসুন প্রিয় নাসিম ভাই। বাংলাদেশ বিরোধী রাজাকারদের মোকাবেলায় আপনাকে আমাদের আরও দরকার। ফিরে আসুন। প্লিজ।

Facebook Comments

You may also like

বাংলাদেশ করোনা মুক্তির সহজ পথ হারিয়েছে

ফজলুল বারী: আমি অস্ট্রেলিয়ায় থাকি বলে বাংলাদেশের সঙ্গে