বরফ পাহাড়ের দেশে

বরফ পাহাড়ের দেশে

100
0

সিডনিতে জুন, জুলাই আর আগষ্ট হচ্ছে অফিসিয়ালি শীতকাল। কিন্তু শীতের আমেজ শুরু হয়ে যায় আরো আগে থেকেই। সিডনিতে শীতকালে তুষারপাত না হলেও সিডনির অন্য কিছু জায়গায় তুষারপাত হয়। স্নোয়ি মাউন্টেইন হচ্ছে তেমনি একটা জায়গা। সিডনি শহর থেকে প্রায় ৫০০ কিলমিটার দূরে এই স্নোয়ি মাউন্টেইন অবস্থিত। এখানে গরমের সময় ছাড়া প্রায় সারাবছর পাহাড়ের চূড়ায় বরফ দেখা যায়। তবে এপ্রিল জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পর্যটকদের ভিড় হয় খুব। এই সময় পর্যটন মৌসুম, হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট সবকিছুর দামও বেড়ে যায় প্রচুর। সিডনি আসার পর থেকেই আমার ইচ্ছা সেখানে যাওয়ার। বিভিন্ন কারনে শীতের সময় আর যাওয়া হয়ে উঠেনা

এইবছর জুলাইতে আমরা চার বন্ধু মিলে ঠিক করলাম এবার আর মিস করা যাবেনা যেতেই হবে যথারীতি আমরা আমাদের পতিদেবতাদের জানালামদেখলাম ওরাও রাজী চিন্তা হল কিভাবে যাওয়াআমরা কি ওইখানে রাতে থাকব, এক্ষেত্রে কেউ রাজী কেউ রাজী না শেষে ডিসিশান হল আমরা ট্যুর বাসে যাব যা পারামাট্টা থেকে রাত ১১টায় ছাড়ে এবং ভোর ৫টায় পৌঁছে  যাবে। আবার পরদিন সেই বাসে চলে আসা যাবে, এটাকে ডে ট্যুর বলে ওরা। আমাদের বাসাও পারামাট্টার কাছে, তাই সবাই মিলে এটাতেই রাজী হল। যাওয়ার একমাস আগেই টিকেট বুকিং দেওয়া হল। এই একমাস যখনি শপিং এ যাই স্নোয়ি মায়ন্টেইনএ যাওয়ার জন্য বিরাট বিরাট জ্যাকেট, স্নো জুতা, ওয়াটারপ্রুফ হাতমোজা সব কিনলাম আমাদের তিনজনের জন্য।

আমরা ২৪শে জুলাই শুক্রবার রাতে “অজিয়া ট্যুর” নামে ট্যুর বাসে যাত্রা শুরু করলাম। আমরা বাচ্চাকাচ্চাসহ সব মিলে ১১জন।  বাস ঠিক রাত ১১.৫০মিনিটে ছাড়ল। আমাদের বাস গাইড নেক পিলো দিলো,ব্ল্যাঙ্কেটও কেউ কেউ নিলো। কিন্তু বাসে হিটার চলছিল তাই এত শীত বোঝা যায়নি। আমি নিজেও মেয়ের জন্য ব্ল্যাঙ্কেট,  পিলো নিয়ে গিয়েছি। বাচ্চারা বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়ল। বাসের সিট মোটামোটি আরামদায়ক ছিল। ভোর ৪টার দিকে জিন্দাবাইন বলে এক জায়গায় বাস যাত্রাবিরতি করল মর্নিং রিফ্রেসমেণ্ট এর জন্য এর আগে ২০মিনিটের যাত্রাবিরতি ছিল শুধু বাথ্রুম করার জন্য, যদিও বাসে ছোট্ট একটা টয়লেট আছে জিন্দাবাইন থেকে পেরিশার একঘন্টার রাস্তা। আমাদের মূল দেখার স্পট হচ্ছে পেরিশার এবং স্মিগিন আর পেরিশার ও থ্রেডবু থেকেই Kosciuszko পাহাড়ের চূড়ায় উঠা যায়। আমি যার নাম দিয়েছি বরফ পাহাড়। এই নাম দেওয়ার একটা কাহিনী আছে। সেটা হল আমি প্রথম যখন স্নোয়ি মাউন্টেইনের কথা শুনি, আমাকে একজন বোঝালো যে এটা পুরোটাই বরফের পাহাড়,মানে এ্টা মাটি বা পাথরের নয়,নিচ থেকে উপর সবই বরফ। আমি তো তখন রীতিমত বিস্মিত। যাইহোক আসলে তা না। এটা পুরোটাই পাথরের উপরে বরফের আস্তরন। তবে এতটাই পুরো যে বরফ পাহাড় বললে ভুল হবে না।

বরফ পাহাড় ছাড়াও আশেপাশে আরও দেখার জায়গা আছে, Kosciuszko ন্যাশনাল পার্ক,লেইক কিন্তু প্রচন্ড ঠাণ্ডা আর বাতাসের কারনে আমরা এই দুই জায়গাতেই যাব্না। আরও বিশেষ করে সবার বাচ্চা সাথে তাই আর আমরা বেশি রিস্ক নিলাম না। জিন্দাবাইনে আমাদের জন্য ট্যুর কোম্পানি থেকে ফ্রি কফি,চ আর বিস্কিট দিল। এখানে শপ আছে জিনিস ধার নেওয়া যায়, স্নো বুট,ভারি জ্যাকেট,ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট,হাত মোজা,স্কি করার জিনিসপত্র এসব। সবাই নিচ্ছে। আমি কাপড় সব কিনেছি এবং সাথে এনেছি কিন্তু আমার বর সবাই নিচ্ছে তাই সেও নিল, আমার ৩বছরের মেয়ের জন্যও নেওয়া হল। সর্বমোট ১০০ ডলারের জিনিস হায়ার করা হল,যেটা দরকার ছিল না। আমরা স্লেজ বোট ও নিলাম স্লেজ স্কি করার জন্য। তারপর সবার ড্রেস পরা হল, চা কফি,ফটোসেশন হল। বাইরে তখন মাইনাস১ ডিগ্রি, আমরা ফটোসেশন করছি তখন সেই শীতে।

আবার যাত্রা শুরু। ট্যুর গাইড আমাদের বলছে বাইরে দেখতে অনেক ক্যাঙ্গারু,ওয়ালাবাই আরো অনেক পশু দেখা যাবে। কিন্তু ভোরের আলো তখন এত ফুটেনি,অন্ধকারে বাইরে শুধু সাদা সাদা বরফের সারি দেখা যাচ্ছে। গাছ দেখছি সেও সাদা। চারিদিকে শুধুই সাদার খেলা। বাসের ভিতর আমরা রোমাঞ্ অনুভব করলাম। আমাদের পিছনে এক কাপল ছিল এরা যাই দেখছে সাথে ওয়াও বলে চিৎকার করছে। ওদের সাথে আমার নিজেরও বলতে ইচ্ছা করল ওয়াও অবশেষে আমার বরফ পাহাড়ে আসা হল। ভোর ৫টায় আমাদের ট্যুরবাস স্মিগিন স্টপে নামিয়ে দিল আর জানিয়ে দিল বিকাল ৩টায় ঠিক এই জায়গা থেকে বাস ছাড়বে। সবাই যেন সময়মত চলে আসি। আমাদের আবার ডিস্কাউন্ট কুপন দিল খাবারের দোকানের যেহেতু বলছিল ট্যুর গাইড এখানে দাম বেশি। বিশেষ করে মেমাস থেকে শুরু করে আগস্ট পর্যন্ত স্নোয়ি মাউন্টেইনের পেরিশার এবং স্মিগিন এ বেশি পর্যটক আসে আর স্পেশালি স্কি করার জন্য পেরিশার দারুন জায়গা। তাই এটাই এদের ব্যবসা করার মৌসুম।

আমরা স্মিগিনএ বাস থেকে নামার সাথে সাথেই প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস এসে স্বাগতম জানালো। আমাদের স্লেজবোড বাতাসের তোড়ে উড়ে গেল অনেক দূর। তখন মাইনাস ৫ডিগ্রী ছিল। ভোরের সূর্যোদয় দেখছিলাম আমরা একটু উপরে উঠে। সাদা পাহাড়ের চূড়ায় ভোরের রোদের আলোর খেলা দেখতে দেখতে রাত জাগার ক্লান্তি ভূলে গেলাম। মনে হলঃ

          “শীতের হাওয়া হঠাৎ ছুটে এল
               গানের বেলা শেষ না হতে হতে?
       মনের কথা ছড়িয়ে এলোমেলো
             ভাসিয়ে দিল শুকনো পাতার স্রোতে।

আমরা সূর্যোদয় দেখা শেষ করে সবাই মিলে  বরফের উপর ছবি তোললাম, বাচ্চারা খুব আনন্দ করতে লাগলো। আমার মেয়ে তো হাত মোজা ছাড়াই স্নোম্যান বানাতে শুরু করল। ট্যুর গাইড আবার সবাইকে একটা করে গাজর দিল স্নোম্যান এর নাক বানানোর জন্য। বাকি দুজনো ওর ফ্রেণ্ড। তিন জনের ছুটোছুটি আর আনন্দ দেখে আমার মনে হল এখানে আসাটা সার্থক হয়েছে।

আমরা রেস্টুরেন্টে গেলাম প্রচন্ড ভিড়। খাবার অর্ডার করা হল। আমি নিজেও অনেক খাবার বানিয়ে নিয়ে গিয়েছি কিন্তু খাওয়া যাচ্ছিল না ঠান্ডার কারনে। ফ্লাস্কের গরম পানিও ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। আমার বর আবার ৫ ডলার দিয়ে গরম পানি কিনে আনল। সবাই চা কফি অর্ডার করে খেলাম।

আবার বাইরে বেরুলাম। এখানে স্কি করছে অনেকে। তাই দেখছি যদিও আমার সাহস নেই স্কি করার। আমরা ফ্রি শাটলবাস ধরে পেরিসার ভ্যালি গেলাম ২০মিনিটের রাস্তা। সেখানে গিয়ে স্লেজ বোড নিয়ে অনেক্ষন খেলা হল। ফটোসেশন হল। বাইরে রোদ থাকলে ও প্রচন্ড বাতাসের বেগ ছিল। মনে হচ্ছে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। যদিও আগেই জানতাম আজ তুষারপাত হবে না। এর আগের শনিবারে তুষারপাত হয়েছিল। সেটা দেখা মিস হল। পেরিশারের পাহাড়ের উপর উঠে সাদা সাদা আরো ছোট বড় পাহাড়ের মাথা দেখা যাচ্ছিল,যা দুপুরের রোদের আলোয় চিকচিক করছিল। আমরা যদিও পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় উঠিনি যেহেতু বাচ্চারা সাথে ছিল, কিন্তু যতটুকু দেখছি , যা দেখছি তাতেই বিস্মিত হচ্ছি, শুধু আমি না আমরা সবাই। সৃষ্ঠিকর্তাকে অনেক ধন্যবাদ এত সুন্দর জিনিস দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আমরা স্মিগিনে ফিরে এলাম। দুপুরের খাবার খাওয়া হল রেস্টুরেন্ট, এত ঠান্ডায় শুধু ফ্রাই নাগেটস এসব আর কফি, তাই বার বার খাওয়া হচ্ছিল। প্রচুর বাতাসের কারনে বাচ্চারা শপিং মলের ভিতরে খেলা করল কিছুসময় ওদের বাবাদের সাথে। আমরা মায়েরা বেড়িয়ে পড়লাম ঘুরতে। বাতাস কমলে আবার ওদের ডাকা হল সবাই মিলে আরো কিছুক্ষন স্লেজে করে স্কি করা হল,স্নোম্যান বানানোর প্রতিযোগিতা হল, বরফ ছোড়াছোড়ি হল,এসব করতে করতেই দেখা গেল ২.৩০ বেজে গেছে। সবাই বাসে উঠে যাচ্ছে। আমরাও সবাই বাচ্চাদের ফ্রেশ করে ড্রেস চেঞ্জ করে ওদের কাছে থেকে হায়ার করা ড্রেস ট্যুর গাইডের কাছে দেওয়া হল। আমরা বাসে উঠে গেলাম। আমার মন বলছিল আরো কিছুক্ষন থাকি,এত ঘুরেও ক্লান্তি আসছে শরীরে কিন্তু মনে আসেনি। বাকি বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লেও আমার মেয়ের ঘুমের কোন লক্ষন নেই। সেও সমান তালে আমার সাথে ঘুরছে,খেলছে। আমি তো আর মুখে বলছি না সে বলছে সে যাবেনা, সে স্নোম্যান এর কাছে থাকবে। ৩.১০ এর দিকে বাস ছেড়ে দিল। যাওয়ার পথে আবার জিন্দাবাইনে ১০ মিনিটের যাত্রাবিরতি। কিন্তু কেউ নামলো না। ট্যুর গাইড সবার হায়ার করা জিনিসপত্র নামিয়ে দিল। শুরু হল আমাদের শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা। যাবার পথের দুধারে চোখে পড়ল সাদা জঙ্গল। ক্যাঙ্গারুর দল যাচ্ছে, আমরা ছবি তুললাম। বাসে মুভি ছেড়েছে।  কিন্তু আমাকে বাইরের প্রকৃতি টানছে বেশি। এই আমার মেয়ে ঘুমালো, আমি বসে বসে বাইরের সূর্যাস্ত দেখছি আর মনে মনে বলছি সৃষ্ঠিকর্তার সৃষ্ঠি এই পৃথিবী এত সুন্দর কেন!!?

আমাদের ৭টার দিকে ২৫মিনিটের জন্য ম্যাকডোনাল্ডে নামালো ডিনার করার জন্য। ডিনার শেষ হলে  আবার যাত্রা শুরু রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমরা পারামাট্টা পৌঁছলাম। তারপর দেখি ওয়েস্টমিডের বাস দাঁড়িয়ে আছে। আমরা বাসার উদ্দেশ্য রওয়ানা দিলাম। বাচ্চারা উঠে গেছে, যদিও আমরা সবাই প্রতিবেশী কিন্তু বড়ই আফসোস আমার বন্ধুরা এই লেখাটা পত্রিকায় আসলেও পড়তে পারবে না, কারন ওরা কেউ বাঙ্গালী না। ২জন উড়িয়া আর একজন সাউথ ইন্ডিয়ান। কিন্তু এরাই আমার আপনজন এই আত্মীয় স্বজন বিহীন সিডনিতে। এদের জন্যই বিদেশের এই মাটিতে একটু সময়ের জন্য হলেও প্রাণ ফিরে পাই। আমার বরফ পাহাড়ে বেড়ানোটাও এদের কারনে কিছুটা হলেও সার্থক।

সুস্মিতা পাল জেমী,সিডনি,অস্ট্রেলিয়া।

Facebook Comments

You may also like

আগুনের দিকে যাচ্ছি

গল্প শেষে চারপাশে ভেসে থাকে তোমার সৌরভ মুর্হুমুহু