ক্ষমা করবেন সারওয়ার ভাই

ক্ষমা করবেন সারওয়ার ভাই

0

ফজলুল বারী:পরিবারশুদ্ধ সারওয়ার ভাইকে জবাই করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। উত্তরার ফ্ল্যাটে সারোয়ার ভাই, তাঁর স্ত্রী ডাঃ মাগদুমা নার্গিস, তাঁদের মেয়ে-মেয়ের জামাইকে জবাই করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রতিবেশী ফ্ল্যাটের লোকজন ছুটে আসাতে ভাগ্যগুনে তারা বেঁচে যান। পত্রিকায় ঘটনার বৃত্তান্ত পড়ে জেনে ভয় করেছে, চোখ ভিজেছে জলে। ডাঃ সারওয়ার আলী একজন স্বনামখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা। উদিচী এবং ছায়ানটের সঙ্গে জড়িত। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি। তাঁদের একটি গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নামের চমৎকার একটি সৃষ্টি গড়ে তুলেছেন। হালকাপাতলা গড়নের খুব সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত সবার প্রিয় সারোয়ার ভাই। কোথাও কারও সঙ্গে কোন বিবাদে নেই। তবে বিবাদতো একটা তাদের আছেই! তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বানিয়েছেন। উদিচী আর ছায়ানটের সঙ্গে কাজ করা নির্বিবাদী মানুষকে জবাই করে খুন করার চেষ্টা করতে পারে কারা তাদেরকেতো আমরা চিনি জানি। এরা দেশের মানুষের কাছে চিহ্নিত ধর্ম ব্যবসায়ী জঙ্গী।

এরা হুমায়ুন আজাদের মতো জ্ঞানতাপসকে জবাই করে হত্যার চেষ্টা করেছে। এরা জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে আসিফ মহিউদ্দিনকে। জবাই করে হত্যা করেছে অভিজিত রায় সহ একের পর মুক্তমনা ব্লগারকে। একটু খেয়াল করে দেখবেন এই জঙ্গীদের টার্গেট তালিকায় কোন দুর্নীতিবাজ-টেন্ডারবাজ-মুনাফাখোর ব্যবসায়ীর নাম নেই! পিঁয়াজের দাম নিয়ে এক শ্রেনীর মুনাফাখোর এক ধরনের জিম্মিকারীর সন্ত্রাসীর ভূমিকা নিয়েছে! এদের কাউকে কোন দিন কোন জঙ্গী জবাই করতে চেয়েছে, এমন কী কেউ শুনেছে? এক সময় দেশের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থীরা শ্রেনী শত্রু নাম দিয়ে অনেককে জবাই করে হত্যা করতো। সেই চরমপন্থী দলগুলো এখন নেই। সে জায়গায় শহরাঞ্চলে এসেছে একদল ধর্মীয় চরমপন্থী জঙ্গী! রাজনৈতিকভাবে অবশ্য এই জঙ্গীদের পৃথক একটি শ্রেনী চরিত্র আছে।

বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত যত জঙ্গী হামলার ঘটেছে এর শিকাররা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন। মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তবুদ্ধির পক্ষের বিজ্ঞানমনস্ক লোকজন, শিল্পী-সাহিত্যিক-কবি-লেখক-সাংবাদিক-সংখ্যালঘু, আওয়ামী লীগ-বামপন্থী নেতাকর্মীরাই এই জঙ্গীদের টার্গেট। বিএনপিকে জঙ্গীরাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি তথা তাদের বিপক্ষশক্তি মনে করেনা। এরজন্যে দেখবেন আজ পর্যন্ত বিএনপির কোন নেতাকর্মী, বিএনপিপন্থী কোন শিল্পী-সাহিত্যিকের ওপর জঙ্গীরা হামলা চালায়নি। বরঞ্চ জঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপি গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। সেই শেখ হাসিনা এখন ক্ষমতায়, খালেদা জিয়া জেলখানায়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের খুব প্রিয় একজন মানুষ এই ডাঃ সারওয়ার আলী। যে কোন তথ্য-বক্তব্যের জন্যে সহজে যোগাযোগ করা যায়, সহযোগিতা পাওয়া যায়, এমন একজন ব্যক্তি এই সারোয়ার ভাই। এত বিশাল একজন মানুষ, এত সাধারন জীবন, যে মিশেছে তাঁর সঙ্গে সেই মুগ্ধ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রথম দিন থেকে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক। সেগুনবাগিচার যে ভবনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যাত্রা শুরু সেখানে এক সময় একটি প্রেস ছিল। বাংলাবাজার পত্রিকাও প্রথম দিন থেকে ছাপা হতো সেই প্রেসে। সেখানেই আমাদের ‘রাতের ঢাকা’ টিমের অনেক রাত কেটেছে। এবং যখন সেখানেই গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সেখানে সর্বক্ষনিক সারওয়ার ভাই-আক্কু চৌধুরীদের উপস্থিতি-সংস্পর্শ, আমাদের মিডিয়া কর্মীদের সহজ তথ্য পাবার বড় অবলম্বন হয়।

এটাই বুঝি বাংলাদেশ বিরোধী মৌলবাদী জঙ্গিদের কাছে সারওয়ার ভাই’র বড় দোষ হিসাবে চিহ্নিত হয়! এমন একজন সারওয়ার ভাইকে তারা জবাই করতে চেয়েছে! কী ভয়ংকর একটি পরিস্থিতি এখন দেশে! মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দলটি এখন ক্ষমতায়। কিন্তু এই সময়েও জঙ্গীরা বেছে বেছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক দেখে দেখে হত্যার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গীরা! অতঃপর এরা টার্গেট করেছিল মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ সারওয়ার আলীকে সপরিবারে জবাই করে হত্যার! এমন একটা লিকলিকে শরীর, তাঁর বুকে চড়ে বসেছে শ্বাপদ শয়তান জঙ্গী। চিৎকার শুনে প্রতিবেশী ছুটে না এলে, ৯৯৯ এর ফোন কল পেয়ে পুলিশের সদস্যরা, প্রতিবেশীর সাহসী ছেলে জঙ্গীদের উদ্দেশে ছুঁড়ে কাঁচের গ্লাস, পুলিশও চলে আসে দ্রুত, জঙ্গীরা এমন তড়িৎ প্রতিরোধ আগে কখনো পায়নি। এই সুযোগে জীবন রক্ষা হয়েছে আমাদের প্রিয় সারওয়ার ভাইর, ভাবীর, তাদের মেয়ে-মেয়ের জামাইর। সবাইকে অশেষ কৃতজ্ঞতা।

ক্ষমা করবেন প্রিয় সারওয়ার ভাই, একটা দেশ স্বাধীন করে দিয়েছেন আপনারা, আমাদের একটা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মতো চমৎকার সৃষ্টি দিয়েছেন। সেই দেশটার বয়স পঞ্চাশ হতে চললো, কিন্তু সেই দেশটাকে আমরা এখনও নিরাপদ করতে পারলামনা। এ দেশে এখন মুক্তিযোদ্ধা সারওয়ার আলীকেও জবাই করে হত্যার চেষ্টা হয়! এটা অবিশ্বাস্য! ক্ষমা করবেন ভাই। কিন্তু একটা শুভ সংবাদ আছে। সামাজিক প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। এটির অন্তত আপনার ঘটনা থেকে সূচনা হলো যেনো। প্রতিবেশী ছুটে এসেছে। ৯৯৯ এ ফোন পেয়ে ছুটে এসেছে পুলিশ! এসব অগ্রগতি। এই জঙ্গীরা পরাস্ত হবেই। কারন এটা পাকিস্তান না। এটা বাংলাদেশ। পাকিস্তানী জঙ্গীর প্রেতাত্মারা পাকিস্তানে ফেরত যা। জাগো প্রিয় প্রজন্ম।

ফজলুল বারী
fazlulbari2014@gmail.com

Facebook Comments

You may also like

রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর ক্ষমতা মেশিন!

ফজলুল বারী: বাংলাদেশে আমাদের গৌরবের আহ্লাদের এক অবিরাম