জাপানের দিনগুলি-৮

জাপানের দিনগুলি-৮

187
0
নৌকায় সুসজ্জিত সাশিমি (সংগৃহীত)

বাঙ্গালীরা অতিথিপরায়ন আর রসনা বিলাসী । তা সেটা চন্দ্রে গেলেও প্রয়োগ হবে । কিছু কিছু বিষয় অলিখিত আইনের মত মানা হয় এখানে । তার একটা হল দাওয়াত খাওয়ানো । কারো এই দেশে, মানে আমাদের অঞ্চলে আগমন ঘটলে, তাকে সবাই দাওয়াত করে খাওয়াবে । সবার দাওয়াত খেয়ে শুধু ঢেকুর তুললেই হবে না, নিউকামারকেও বাংলাদেশ থেকে আনা চিকন কালিজীরা চালটাকেও ফুটাতে হবে পুরাতনদের জন্য । তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন শুরুর আগে কিছুদিন পার্টির হুলুস্থূল পরে যায় ।

জাপানীজ-বন্ধুর-বাসায়-দাওয়াতে-আমরা

সহধর্মীনী জাপানে প্রবেশ করার সাথে সাথে পার্টির একটা সিজন সিজন ভাব আসলো আমাদের বাসাটাতে । স্থানীয় বাঙালীদের আমন্ত্রন করে প্রথমে করা হল বাঙ্গালিদের পার্টি । এখানকার বাজারে সব কিছু পাওয়া যায় না । টোকিওর হালাল দোকানগুলোর উপর নির্ভর করতে হয় । শুকনো ম্যাটিরিয়ালের সরবরাহ বাংলাদেশ থেকেই এসেছে। কাচাগুলোর ব্যবস্থা করলাম টোকিও থেকে । জাপানের মানুষগুলো হালকা পাতলা তাই ঘরগুলোও চিপেচাপা । সুমো রেসলারদের কথা অবশ্য আলাদা । সেই ছোটখাট ঘরেই বাঙ্গালীরা উপচে পরল । কথা বর্তার ফুলঝুরিতে বুঝতে কষ্ট হলোনা ল্যাবে ইংরেজি ও জাপানীজ বলতে বলতে ফেডঅ্যাপ হয়েছে সবাই । বাংলা ভাষায় কথা বলার এই সুযোগটা কেউ হাতছাড়া করতে চাইল না । যে যেভাবে পারলা জমিয়ে রাখলো আসর ।

পার্টির নামটায় পশ্চিমাভাব থাকলেও, সেই জাতীয় কিছু না । চিরপরিচিত বাংলাদেশের ডিস থরে থরে সাজানো হয় অতিথিদের সামনে । চেয়ার টেবিল কিংবা ডাইনিং টেবিলের কোন বালাই নেই । দাওয়াতীদের হাতে বিভিন্ন সাইজের প্লেট । খাবার সার্ভে দেরী হলে হাতে নেয়া প্লেটখানা হয়ে যায় ঢোল। সামনে রাখা চামচখানা হয়ে যায় থালা বাজানোর স্টিক । শুরু হয় সঙ্গীত । ইউরোপিয়ানরা নাকি প্রার্থনা করে খাবার সামনে রেখে । সম্পুর্ন বিপরীত ধাচের ক্রিয়া কর্ম শুরু হয় এখানকার মেহমানদারিতে । সার্ভ করা লাগে না পার্টিগুলোতে । সবাই নিজের মত করে খেয়ে নেয়। আনন্দে এতই মশগুল থাকে যে ওভেনে গরম করতে দেয়া মেনু অনেক সময় ওভেনেই থেকে যায় । খাবার শেষে সবাই যখন তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তখন হোস্টের মনে পরে যায় গরম করতে দেয়া মেনুটির কথা!

জাপানীরা হিসেবী জাতি। প্রত্যেকের ঘরে ঘরে হিসেব নিকেশের খাতা থাকে । হিসেবী হলেও বিদেশ থেকে আসা ছাত্রদের বেলায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিপ্টামি একটু কমই করে । ওয়েলকাম পার্টি, গ্রাজুয়েশন পার্টি, বিদায়ী পার্টিগুলো বেশ ঘটা করেই পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো । স্টারযুক্ত হোটেলগুলোতে পার্টির ব্যবস্থা করবেই । সুশি, সাশিমি দিয়ে টেবিল সাজিয়ে রাখবে । আস্ত একটা মাছের সাশিমি মাথাসহ ছোট্ট নৌকায় সাজিয়ে রাখবে । ফলগুলো সাজানোর ধরন দেখলে মনে হবে ফলের আড়তে আছি । এই সমস্ত পার্টিগুলোতে উপদেশপুর্ন ভাষন একটু কমই হয় । কাম্পাই( টোস্ট ) বলে বাতাসের সাথে হাতের গ্লাসটাকে ধাক্কা লাগালেই বুঝতাম ঝাপিয়ে পরার সময় হয়েছে । সেল্ফ সার্ভিস ! তাই সবার সাথে দলবেধে নেমে পরতাম হুরাহুরি বিহীন যুদ্ধ ক্ষেত্রে । খাবার সিলেকসনের ধরন দেখেই একটা প্রাথমিক ধারনা নেয়া যায় কে নতুন আর কে পুরাতন । প্রথম বার নতুন হওয়ায় নিজের ভুল টের পায়নি । দ্বিতীয় বার পার্টিসিপেট করতে যেয়ে বুঝলাম কেমন করেছিলাম প্রথম পার্টিতে অংশগ্রহনের সময় । রিলিজিয়ন সম্পর্কেও একটু আন্দাজ করা যায় । পাশের জাপানীজ মানুষটিকে অনেকবার ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করেছি বুতার ( শুকুরের ) মাংস আছে কিনা মেনুটিতে ? আমার সহধর্মীনী তো একবার এক জাপানীজকে একটা মিষ্টি জাতীয় খাবার দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল শুকুরের মাংস আছে কিনা?  সেই জাপানীজ ছোট চোখদুটিকে যতদুর সম্ভব বড় করে তাকালেও, উত্তর দিয়েছিল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে । জাপানে পা দিয়েই একটা জাপানিজ অক্ষর হ্রদয়ঙ্গম করেছিলাম হালাল হারামে পার্থক্য ডিফাইন করতে । আর সেটি ছিল শুকুরকে বোঝানোর অক্ষর । আমার নাকে রুমাল না থাকলেও গিন্নীর রুমালখানা নাক ঢাকার কাজে ভালই সার্ভিস দিয়েছিল । মাছ ও মাংসের ধারে কাছেই যাননি উনি । ডেজার্ট ও ফলমুল দিয়েই সেরেছিলেন উদরপূর্তির কাজটি । শামুকের মেনু দেখে তো পারলে …। আমার অস্বস্তি   লাগলেও চোখ বন্ধ করে গিলে ফেলেছিলাম ঝিনুকের ভিতরের মাংসটুকু । সেদিন আমি নাক সিটকালেও এখন হাসের মতই গপাগপ গিলি শামুক কিংবা ঝিনুকের মেনুগুলো । সহধর্মীনী এখনো নাক কুচকায় মেনুগুলো দেখলেই ।

প্রফেসর কিংবা ল্যাবের সহকর্মীদের বাংলাদেশী খাবার খাওয়ানোর রেওয়াজ আছে এখানে । জাপানীজ ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও দাওয়াত পায় বাঙ্গালীদের বাসাগুলোতে । সরস প্রফেসর হলে দাওয়াত দেয় ছাত্রটিকেও । তবে দাওয়াতের স্থান বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই রেস্টূরেন্ট এ । প্রফেসরদের বাসা দেখার সুযোগ খুব কমই হয় বিদেশী ছাত্রগুলোর । আমি লাকি ছিলাম! বেশ কয়েকবার গিয়েছি প্রফেসরের বাসায় ।

স্বস্ত্রিক-প্রফেসর-ও-আমি

জাপানীদের খাবারে কোন বাছবিচার নেই । যে কোন খাবারে ট্রাই ওরা করবেই । তবে ভয় পায় মাছের কাটা, মাংসের হাড়, আর ঝাল খাবার । ওদের দেশে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী ঝালযুক্ত মরিচ উৎপাদন হলেও ঝালযুক্ত খাবারগুলোকে যমের মত ভয় পায় । তবে হোস্টকে বুঝতে দেবেনা যে ঝাল হয়েছে মেনুটি । এক লোকমা মুখে দিয়েই হাতে উঠে আসে ড্রিংক্সের গ্লাস, না হয় হাতখানা চলে যায় রুমাল কিংবা টিসুতে কপালের ঘাম দুর করতে । মাছের কাটা ওরা খায় না । বাংলাদেশের জাতীয় মাছকে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য ইলিশ মাছের দো পেয়াজা রেডি করেছিলাম । জাপানীজরা হাত কিংবা চামচ ব্যবহার খুব কমই করে খাবার গ্রহনের সময় । চপস্টিক্স দিয়ে ওরা হাত কিংবা চামচের কাজটা সেরে নেয় । কিন্তু ইলিশ মাছের কাটা চপস্টিক্স দিয়ে দুর করা যে বেশ দুরহ সেটা ওদের কোনদিন বোঝাতে পারিনি । চেয়ে চেয়ে দেখেছি ওদের মাছের কাটা ছাড়ানোর অদম্য চেষ্টা। চিংড়ীর ভুনা ঝাল হলেও খাওয়ার ধরন দেখে মনে হয়েছিল অমৃত খাচ্ছে । আমার গিন্নীর একটা গুন আছে । কেউ যদি ওর রান্নার প্রশংসা করে তবে তার পাতে এক্সট্রা এক চামচ সার্ভ হবেই । আমি এই লাভজনক আবিস্কারটা অনেক দেরিতে করেছি ! প্রফেসররা খাচ্ছে , ঐশি ঐশি (মজা) করছে আর সহধর্মীনী সার্ভ করেই গেলেন । ডেলিশাসও বেরুলো দু এজনের মুখ থেকে ।ঝালের যন্ত্রনায় শীতকালেও ঘামছে । ঘাম মোছা ও খাবারের কাজ সমান্তরালে চলেছিল বেশ কিছুক্ষন ।

আরো পড়ুন :

জাপানের দিনগুলি-১

জাপানের দিনগুলি-২

জাপানের দিনগুলি-৩

জাপানের দিনগুলি-৪

জাপানের দিনগুলি-৫

জাপানের দিনগুলি-

জাপানের দিনগুলি-৭

( মোঃ মাহবুবর রহমান , তোত্তরি, জাপান )
মোঃ মাহবুবর রহমান , তোত্তরি, জাপান

Facebook Comments

You may also like

প্রেক্ষাপটঃ “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এবং “একুশে’র বিশ্বায়ন” -(চতুর্থ পর্ব)

‘টুয়েন্টি ফাস্ট (একুশে) ফেব্রুয়ারি’ ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত “আন্তর্জাতিক